বুধবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৭

অনেকদিনের আমার যে গান

ছুটন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে দ্রুত সরে যাওয়া ধানখেত আর গাছেদের সারির মত চলে যায় জীবন। একটা সময় ছিল, দূর অতীতের সেই সময়ে, বড় হওয়ার দিন আসতে চাইত না। কবে গালে দাড়ি উঠবে, বাবা কাকাদের মত ঠোঁটে সিগারেট ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো যাবে জনসমাজে, তার ছিল অন্তহীন অপেক্ষা। এখন জানুয়ারি এলেই ঝড়ের গতিতে চলে আসে ডিসেম্বর। পাগলা ঘোড়ার মত দ্রুত দিগন্তের রেখার দিকে ছুটে যাচ্ছে আয়ুর অশ্ব।‘না আছে তার পায়ে রেকাব, না আছে তার হাত লাগামে। মশারির মত ঘরের এ কোণ থেকে ও কোণ অবধি টাঙানো রেডিওর অ্যারিয়েল দিয়ে শুরু হয়েছিল যে শৈশব, সে আজ প্রৌঢ়ত্বে রেড-মি ফোর মোবাইলে ইউনিকোডে টাইপ করে ছেলেবেলার হারিয়ে যাওয়া ছড়ার পংক্তি খোঁজে। শৈশবে শিলং-এর নীচের বাড়িতে কদাচিৎ বেজে উঠত উঁচু টুলের উপর রাখা কালো টেলিফোন। একবার বাজলে ঝনঝনিয়ে উঠত পাড়ার সবথেকে নীচের বাড়ি থেকে সব থেকে ওপরের বাড়ির ঘরের কোণও। অনেক দূর থেকে শোনা যেতো টেলিফোনে কথা বলা। ট্রাঙ্ক কল এলে বোঝা যেতো, কারণ তার আওয়াজ হতো একটানা। সাধারণ কলের মত থেমে থেমে নয়। ট্রাঙ্ক কলের কথোপকথনও হত আরো উঁচু তারে বাঁধা, পাশ্চাত্যের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সম্ভবত যাকে বলে সোপ্রানো।


তখন শীতকাল মানেই ক্রিকেট আর কমলালেবু। এখনকার চল্লিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে এক শরীর ঘাম নিয়ে রঙীন পোশাক আর সাদা বলের বাণিজ্য নয়। সুরুচি, সংযম আর শিষ্টাচারের অপর নাম ছিল ক্রিকেট। খেলোয়াড়দের ধবধবে সাদা পোশাকের মত অমলিন ছিল ক্রিকেট। ‘গুড মর্নিং, দিস ইজ ডিকি রত্নাগর রিপোর্টিং ইউ ফ্রম দ্য ইডেন গার্ডেন ক্যালকাটা। বিউটিফুল সানি উইন্টারি মর্নিং উইথ লাশ গ্রীন আউটফিল্ড, স্টেডিয়াম ফুল টু দ্য ক্যাপাসিটি, উই উইল টেক ইউ থ্রু দ্য নেক্সট ফাইভ ডেইজ অব এক্সাইটিং এন্ড বেস্ট ক্রিকেট। উই এক্সপেক্ট ইট টু বি প্লেড ইন দ্য ট্রুয়েস্ট স্পিরিট অব দ্য গেম।‘ আমাদের ইংরেজি বলার প্রথম পাঠ ডিকি রত্নাগর, আনন্দ শীতলাবাদ, নরোত্তম পুরীর কাছে। তখনো আন্তর্জাতিক ফুটবলের সাথে আমাদের পরিচয় খবরের কাগজের খেলার পাতাতেই, কিংবা ‘গড়ের মাঠ‘, ‘অলিম্পিক‘ বা ‘স্টেডিয়াম‘ পত্রিকার মধ্য দিয়েই। খবরের কাগজের পাতার স্থির চিত্রের মধ্যেই আমরা খুঁজে পেতাম স্ট্যানলি ম্যাথিউজ, পেলে, ইউসেবিও বা ববি চার্লটনের গতি, লেভ ইয়াসিন বা পিটার থঙ্গরাজের দুর্দান্ত ডাইভ। ফুটবলের ধারাবিবরণী মানে অজয় বসু বা পুষ্পেন সরকার। হকি মানে যশদেব সিং। ক্রিকেট ইংরেজি, হকি হিন্দী আর ফুটবল বাংলা। রেডিও ধারাবিবরণীর ভাষা মানচিত্রের বিভাজন ছিল এভাবেই। হারিয়ে গেছে ওই দিনগুলি। হারিয়ে গেছে শর্ট ওয়েভে বিদেশের মাটিতে হওয়া ক্রিকেট ম্যাচের ধারা বিবরণীর আওয়াজের হ্রাসবৃদ্ধি। মোক্ষম মুহূর্তে হঠাৎ রেডিওর আওয়াজ যেত মিইয়ে। তখন সকলের কান এগিয়ে গেছে রেডিওর দিকে। গায়ে গায়ে থাকা অন্য রেডিও স্টেশনের সিগন্যাল এসে অস্পষ্ট করে দিচ্ছে কাঙ্খিত কন্ঠস্বর। কী হল? ভালো, না মন্দ? ঠাওর করা যাচ্ছে না। হয়ত কেউ রেডিও থেকে কান সরিয়ে এনে উচ্ছসিত আনন্দে বললেন ‘চার!‘, পর মুহূর্তেই আরেকজন ব্যাজার মুখ করে বললেন, ‘না, না আউট‘। মুহূর্তে বিষাদ নেমে এলো।


মনে পড়ে, লর্ডসে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের প্যাভিলিয়নমুখী লম্বা মিছিল। একটু পরেই ইনিংস বিয়াল্লিশে গুঁড়িয়ে যাবে। ক্রিস ওল্ড আর ম্যাথিউ আর্নল্ড যেন মৃত্যুদূত। জেঠু বলল, ‘চলো, ঠাকুর ঘরে যাই‘। ঠাকুর ঘরে আমি আর জেঠু ষাষ্টাঙ্গে মাটিতে। পেছনে রেডিও থেকে ভেসে আসছে মৃত্যুবিবরণী। একনাথ সোলকারের অপরাজিত ষোলো যেন গারফিল্ড সোবার্সের তিনশো পঁয়ষট্টি। বোকার মতো ক্যাচ তুলে অনুশোচনায় মাথার ঝাঁকুনিতে যেভাবে মাথার টুপি বেলের ওপর পড়তেই খসে পড়েছিল ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের রাজা ও টেস্ট ম্যাচের ভিখিরি অশোক মানকড়ের উইকেট ও ক্রিকেটজীবন, সেভাবেই চলে গেলে আমাদের সোনাঝরা দিনও।


যা হারিয়ে যায়, তা আগলে বসে রইব কত আর। কিন্তু স্বপ্নে যে দেখা দেয় সেই দিনগুলি। ঘুমের মধ্যে ডুকরে কেঁদে খুঁজে বেড়াই আমার সবচাওয়ার সবপাওয়ার জেঠুকে। হঠাৎ দেখি শিলং এর ওয়ার্ড লেক আর গভর্নর হাউসের মাঝের এঁকে বেঁকে যাওয়া রাস্তা দিয়ে লুঙ্গির মত ধুতি পরা, ধূসর রঙের দিদির বুনে দেওয়া পুলোওভার গায়ে হেঁটে আসছে জেঠু। হাতে উইলসের তামাক আর সাদা পাতা দিয়ে নিজের হাতে তৈরি করা ‘মিক্সচার‘ এর সিগারেট। আমি ‘জেঠু‘ বলে ছুটে যেতেই ঘুম ভেঙে যায়। দেখি পাশে স্ত্রী আর পুত্র শুয়ে আছে, শুয়ে আছে একটা অন্য জীবন। এ যেন অন্য একটা পৃথিবী। চারপাশে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলোর মধ্যে জেঠুকে আর খুঁজি পাই না। বাবা মা জেঠাইমা বড়দা মেজদারা বলত, জেঠু সংসারী নয়। সর্বক্ষণ ‘ঠাকুর ঠাকুর‘, আর শীতকাল এলে ‘ক্রিকেট ক্রিকেট‘ করে। জেঠুর ‘ঠাকুর ঠাকুর‘ও এখন কারো মধ্যে দেখি না। জেঠুর ‘ঠাকুর ঠাকুর‘ মানে প্রতি সন্ধ্যায় কারো না কারো মুখোমুখি বসে গান শোনা। গান শুনতে শুনতে চোখ বুঁজে ধ্যাণস্থ হওয়া আর নিঃশব্দে কেঁদে যাওয়া। দু চোখ দিয়ে অঝোরে ঝরে যায় জল। আজন্ম দেখেছি, ফলে অবাক হই নি। পাশের ঘরের নতুন ভাড়াটের বাচ্চা অবাক হয়ে মা’কে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘দাদু, কাঁদছে কেন?‘। তার মা’র কাছে উত্তর ছিল না। আজও আমাদের কাছে নেই। কী সেই বিপন্ন বিস্ময় যা জেঠুর অন্তর্গত রক্তের ভেতর খেলা করত! বড়ো হয়ে জেনেছি মারিফত পন্থায় গানই হচ্ছে এবাদত, পরমের সাথে সেতু। প্রতিদিনের একক গায়ক ও একক শ্রোতার গানের এবাদত মাঝে মাঝে সম্প্রসারিত হত বাড়ির কীর্তনের আসরে। সেখানে বাজারের আলুওয়ালা গণেশ গাইতেন ‘তোমার বদল দিয়া যাও বাঁশি ও প্রাণনাথ‘, বাড়িতে যিনি রক্ত পরীক্ষার রক্ত সংগ্রহ করতে আসতেন অন্য সময় তিনি সেই আসরে গাইতেন ‘শিবের বুকে দাঁড়িয়ে কেন বল মা শ্যামা শিবানী গো‘। আমাদের বাড়িতে যিনি রান্নার কাজ করতেন তিনি গাইতেন ‘পিঞ্জিরার পাখির মত উইড়া গিয়া দেখি কোথায় গো আমার কালো পাখি‘। বাবা গাইত ‘আজি বিজন ঘরে‘। দিদিরা গাইত, মা গাইত। জেঠু কেঁদে যেত। কেঁদেই যেত। ‘আমার যেদিন ভেসে গেছে চোখের জলে/ সেদিন যে রাগিনী গেছে থেমে, অতল বিরহে নেমে গেছে থেমে/ আজি পূবের হাওয়ায় হাওয়ায়, হায় হায় হায় রে কাঁপন ভেসে চলে।‘


এক একর জমির শিলং কেঞ্চেস ট্রেসের বাড়িতে ভাড়া থাকতাম আমরা একটা সময়ে। ওই বাড়িতে ফলের বাগান ছিল, সব্জির বাগান ছিল, ফুলের বাগান ছিল, গাড়ি বারান্দা ছিল। আর ছিল তিরতিরি করে বয়ে যাওয়া একটা পাহাড়ি ছড়া। রাত্তিরে বিছানায় শুতে গেলে লেপের তলা থেকে শুনতে পেতাম পাইন গাছের পাতার সাথে বাতাসের কানাকানি। সেই সাঁইসাঁই শব্দে ঘুমিয়ে পড়তাম মায়ের কোমড়ে হাত জড়িয়ে, বুকে মুখ গুঁজে। ভোরে আমাদের ঘরের নীচে কাঠের প্ল্যাঙ্কিং এর তলার মুরগীর ঘর থেকে কোঁকর কোঁ শব্দে ঘুম ভাঙত। ছড়া পেরিয়ে লাবান পাহাড়ের ‘হাতি পাথর‘ এর ওপর দিয়ে কমলা গাছের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো পড়ত আমাদের পূবের বারান্দায়। সেখানে কাঞ্চার তৈরি চা পাউঁরুটি টোস্ট খেতে খেতে তাকিয়ে থাকতাম পাহাড়ের দিকে। রাতে যদিও কোনোদিনই তাকাতাম না ওদিকে। কারণ অন্ধকার নামলেই মনে পড়ত ওই অন্ধকার পাহাড়ে গাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেছে ত্রিপুরা পণ্ডিতের ছেলে। এ নিয়ে বাড়িতে আসা অতিথিদের সাথে মায়েরা অনেক দিন গল্প করেছে। কেন মরল? এই প্রশ্ন এলেই চোখ দিয়ে আমাদের দেখিয়ে আলোচনা নেমে আসতো খাদে, একটা পর্যায়ে ফিসফিসানিতে। প্রবল আগ্রহে কান পেতে এর মধ্যেই ঠিক শুনে নিতাম একটি মেয়ের নাম।


আমাদের বাড়ির প্লাম গাছের ইংরেজি ওয়াইয়ের মত একটি ডাল কেটে ফুটবলের ব্লাডারের রাবার দিয়ে একটি অসাধারণ গুলতি বানিয়ে দিয়েছিল আমাদের কাঞ্চা। গাছের ডাল আর ব্লাডারের রাবারের নমনীয়তা গুলতিকে দিয়েছিল একটা অভূতপূর্বে দূরত্বে নিশানা করার ক্ষমতা। পুটিংয়ের গোলায় একবারই নিক্ষেপ করেছিলাম আমার গুলতি। বাড়ির মালিকের বড় ছেলে সিম ‘দেখি দেখি‘ বলে আমার হাত থেকে নিয়ে একবার ক্ষমতা পরখ করেই পায়ের হিলের এক ঘায়ে ভেঙে দিয়েছিল আমার সাধের গুলতি। এতটা প্রতিহিংসাপরায়ণ কেউ হয়, বিশেষ করে আমার সেই বয়সের হিরো বাড়ির মালিকের বড় ছেলে সিম এমনটা হতে পারে, আমার ধারণা ছিল না। আমার এই অকিঞ্চিৎকর জীবনে এর চেয়ে বড় প্রতারিত হওয়ার আর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রতিবাদ করতে পারি নি, কাঁদতে পারি নি। বড়দের কাছে নালিশ করেছি। ‘কী আছে, আরেকটা তৈরি করে দেবে কাঞ্চা‘ বলে সকলে এড়িয়ে গেছে। জীবনে আর কোনো গুলতি এত নিখুঁত হয় নি। কেঁদেছি স্বপ্নে বহুদিন, বহু বহু দিন। আবার কখনো দেখেছি চালের ড্রামের ভেতর হঠাৎ খুঁজে পেয়েছি সেই স্বপ্নের গুলতি। কখনো বাড়ির ছড়ার পারে পড়ে থাকা গুলতিটা দেখেছি কেমন জোড়া লেগে গেছে নিজে নিজেই। আনন্দে নেচে উঠবো। ঘুম ভেঙে গেছে। আমার চারপাশে গভীর রাতের অন্ধকার ছাড়া আর কিছু সত্য ছিল না তখন। ওই গুলতির জন্যে এখনও আমার দীর্ঘশ্বাসের শেষ নেই। এমনকি এই বড়ো অবেলায় ল্যাপটপে টাইপ করতে করতেও বুকের ভেতর কে যেন কেঁদেই চলেছে। আমি এখনও অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি সিমের সেই ক্রুর হাসির দিকে।


আমার জন্ম শিলং এর গণেশ দাস চিলড্রেন হসপিটেলে। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি। ন বছর বয়স অবধি শিলংয়েই ছিলাম। তারপরও বেড়াতে, গান গাইতে গিয়েছি অসংখ্যবার। জন্মের পর হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসার পর আর কখনো ওই হাসপাতালে যাই নি। গণেশদাস হাসপাতাল আমি দেখতেও চাই না। ছোটবেলা থেকে কল্পনায় সেই হাসপাতালের একটা অবয়ব রয়েছে আমার কাছে। এটা আমি হারাতে চাই না। দেখিনি বলেই হারাইও নি। তবে সেই হাসপাতাল থেকে যে আমাকে কোলে করে বাড়িতে এনেছিল তার নাম রাম, তাকে হারিয়েছি। পুরো নাম ছিল নিমারাম উপাধ্যায়। আমাদের বাড়ির নেপালি গৃহকর্মী। সকাল সন্ধ্যে আমাদের রান্নাঘরে কাজ করত, দিনের বেলায় বাবাদের অফিসের পিওন। মা’র কাছে শুনেছি, আমি প্রথমে ‘মা‘ ডাকি নি, রামকে ‘আম‘ বলে ডাকার মধ্য দিয়েই আমার কথা ফোটা। রামের কোলের ওম আমি আজো ভুলি না। প্রতি বছর রাম ছুটি নিয়ে একমাসের জন্যে নেপালের বিরাট নগরে ছেলে বউয়ের কাছে যেতো। যাওয়ার আগে আমাকে শার্ট প্যান্ট জুতো মোজা কিনে দিয়ে যেতো। রামের বিছানায় একটা তেল চিটচিটে বোঁটকা গন্ধ ছিল। মানে ওই গন্ধ যে বোঁটকা সেটা বড়দের কথায় শুনেছি। ভোরবেলা ঘুম ভাঙলেই সেই বোঁটকা গন্ধওয়ালা বিছানায় চলে যেতাম। রামের পাশে শুয়ে থাকতে ভীষণ ভালো লাগত। ন বছর বয়স অবধি আমার সেটা প্রায় নিত্যকর্ম ছিল। রামের বিছানার গন্ধ আমি এখনও নাকে টের পাই। ওই গন্ধ এখনও আমাকে ডাকে। ছোটবেলায় আমাকে দেখাশোনা করত যে খাসি রমণী সে আমাকে তার পিঠে চাদর দিয়ে বেঁধে ঘরের কাজ করত, রাস্তায় বেড়াতে নিয়ে যেতো। তাঁকে আমি ডাকাতম ‘কং‘। কং মানে খাসি ভাষায় দিদি। খাসি রমণীকে এই সম্বোধনই করা হয় ওখানে। কং-এর পিঠে চেপে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ আমি ট্রেন প্লেন জাহাজ চড়েও পাই নি। ওটাই আমার জীবনের সেরা যান। ঘুরতে ঘুরতে কখনো পেছন থেকে কংকে জড়িয়ে ধরে আদর করতাম, কখনো রেগে গেলে মারতাম, চুল টানতাম। কং চা খেতে খেতে ওর মুখের এঁটো কাপ থেকেই আমাকে চা খেতে দিত। দাঁত দিয়ে অর্ধেক বিস্কুট ভেঙে বাকিটা পেছনে হাত বাড়িয়ে আমাকে দিত। শিলং এর কাঁচা সুপুরি ও খাসি পানপাতার ভীষণ কড়া ‘কোয়াই পান‘ খেতো কং। অর্ধেক মুখে দিয়ে বাকিটা আমাকে দিত। তিন চার বছরের আমিও কং এর মত তর্জনীর মাথা থেকে জিভে চূণ ঠেকাতাম। ঠোঁট লাল হয়ে যেতো। বাবার বন্ধুরা বাড়িতে এসে বলতেন, আপনার শ্রীমানকে দেখলাম কংএর পিঠে খাসি বাচ্চার মত ঠোঁট লাল করে চলেছে। বাবারা কংকে কিছু বলত না। কং বাজারে সব্জির দোকানও দিত। আমাকেও সেখানে নিয়ে যেতো। কংয়ের হাতের নাগালের বাইরে থেকে ফুলকপি, সিম, টমেটো আমি এনে পাল্লায় তুলে দিতাম। পরেও কিশোর বয়সে যখন আর কং আমাদের বাড়ি কাজ করত না তখনও বাজারে গেলে আমি কংএর পাশে বসে থাকতাম। বাবা বাজার শেষ করে আমাকে নিয়ে যেতো। আমি ততক্ষণ কংয়ের সহকারী হিসেবে কাজ করতাম। আসার সময় কং আমাকে একটা ফুলকপি বা বাঁধাকপি কিছু একটা দিয়ে দিত।


ন বছর বয়সে যখন শিলং ছেড়ে চলে আসি শিলচরে তখন আমাদের বাড়িতে পোষা একটা কুকুর ছিল, নাম জাম্বো। এর আগে একটা সাদা ককাস স্প্যানিয়েল ছিল। সাদা ছিল বলে নাম দেওয়া হয়েছিল গোরা। আমরা বলতাম গোরার ভালো নাম গৌরাঙ্গ প্রসাদ নন্দী মজুমদার। জেঠু একটু রাগ করেছিল বটে। কিন্তু গোরা মাছ মাংস খেত না, জেঠুর কীর্তনের আসরে বাইরে ঠায় বসে থাকত বলে জেঠুর ওর প্রতি একটু দুর্বলতা ছিল। আমরা যখন চলে আসি, আমরা জানতাম জাম্বোও আমাদের সাথে আসবে। জিনিষপত্র গোছানোর সঙ্গে সঙ্গে জাম্বোর জিনিষপত্রও গোছানো হচ্ছিল। তখন আসাম স্টেট ট্রান্সপোর্টের কালো অ্যাম্বেসেডার ভাড়া পাওয়া যেতো। গায়ে গণ্ডারের অ্যাম্বব্লেম। ওটাকে বলা হত ফার্স্ট ক্লাস। বাবা শিলচর যাওয়ার জন্যে ফার্স্ট ক্লাস ভাড়া করেছিল। সকালবেলা সব জিনিষ যখন উঠছে তখন ফার্স্ট ক্লাসের ড্রাইভার বলল, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া কুকুর নিয়ে যাওয়া যাবে না। সেই শুনে আমাদের ভাইবোনেদের কী কান্না। আমরা গাড়িতে উঠে চলে এলাম। দূরে জাম্বো আমার পিসতুতো দাদা সেজদার হাতে চেনে বাঁধা আমাদের গাড়ির দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। গাড়িটা দূর থেকে দূরে মিলিয়ে গেল। সেই কান্না আমাদের আজো গেল না। সেজদা তখন ব্যাচেলার ছিল। বাড়ি ফেরার কোনো ঠিক ছিল না। সেজন্যে জাম্বোকে ছেড়ে রাখত। জাম্বো পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতো অনাথের মত। কেউ খেতে দিত, কেউ মেরে তাড়াতো। এক বন্ধু পরে চিঠি লিখে জানিয়েছিল, তোদের জাম্বো পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। লোকে মারে। শুকিয়ে গেছে। গায়ে রাস্তার কুকুরের মত ঘা হয়ে গেছে। আমি চিঠি পড়ে কেঁদে ভাসিয়েছি। কবে জাম্বো মারা গেছে সেই খবরও পাই নি। এখন বড়ো হয়ে আমার মনে হয়, সেদিন ড্রাইভারের সেই কথাটা নিশ্চয়ই আমার অভিভাবকদের শিখিয়ে দেওয়া কথা ছিল। একটা কুকুরের জন্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ব্যাপারটা নিশ্চয়ই একটু বাড়াবাড়িই।


ছোটবেলা থেকে দেখতাম বাড়িতে কেউ এলে মা-বাবারা অবধারিতভাবে জিজ্ঞেস করত, বাড়ি কোথায় ছিল? উত্তরে হয়ত বললেন সিলেটের অমুক গ্রামে। সঙ্গে সঙ্গে বাবা মা কোনো একটা যোগাযোগের প্রসঙ্গ তুলে একটা আত্মীয়তার বাঁধনে বাঁধতে চাইতেন। হয়ত বললেন সিলেট শহরে বাড়ি ছিল। বাবা জিজ্ঞেস করল, কোন্ পাড়া। ওরা বললেন। তারপর প্রশ্ন, কোন্ বাড়িটা? তারপর সেটাও বললেন। বাবা এরপর বলল হয়ত একটা দোকান ছিল যে মিষ্টির, তার কোন দিকে? তিনি হয়ত বললেন, তার উল্টো দিকেই। এবারে বিজয়ীর হাসি দুজনেরই মুখে, চিহ্নিত করা গেছে বা চেনানো গেছে। তারপরের মুহূর্তেই দীর্ঘশ্বাস। ‘আর কী হবে! সব গেল! কী ছিল আমাদের জীবন, আর এখন কী হল!‘ মুহূর্তে ভারি হয়ে যেতো পরিবেশ। কথা বলতে বলতে হয়ত কেউ চোখ মুছতেন, কেউ ঘনঘন মাথা নাড়তেন। এই ঘর হারানোর হাহাকার আমার শৈশব। এই চোখের জলেই আমার ‘স্বদেশ‘এর সাথে পরিচয়। এই ধরনের অসংখ্য কথোপকথন শুনতে শুনতে আমাদের বড় হওয়া। অসংখ্য গ্রামের নাম, রেল স্টেশনের নাম, দোকানের নাম, পাড়ার নাম, স্কুলের নাম, কলেজের নাম, বিশিষ্ট মানুষের নাম, বংশের নাম- এভাবে আমাদের মুখস্থ হয়ে যেতো। কল্পনায় আমরা আমাদের পিতৃপ্রজন্মের ভিটে বাড়ি সব দেখতে পেতাম।


১৯৯৯ সালে প্রথম ওপারে গেলাম বড়ো হয়ে। করিমগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর ওপারে জকিগঞ্জই বাংলাদেশ। নদীটা আন্তর্জাতিক সীমানা। নদীর এপার থেকে ওপার দেখা যায়। মানুষের চলাফেরা দেখা যায়, বাড়ি দেখা যায়, গাড়ি দেখা যায়, গাছপালা দেখা যায়। করিমগঞ্জে এলেই সাধারণত আমরা একবার কালীবাড়ির ঘাটে এসে ওপারের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মনে মনে গাইতাম ‘আমার নাইবা হল পারে যাওয়া/.... নেই যদি বা জমল পাড়ি ঘাট আছে তো বসতে পারি/ আমার সারাদিনের এই কি রে কাজ ওপার পানে কেঁদে চাওয়া?‘ সেদিন নৌকোয় চেপে বসেছি। একটু একটু করে দূরে যাচ্ছে ‘দেশ‘, একটু একটু করে আসছে আমার মায়ের দীর্ঘশ্বাস, বাবার চোখের অশ্রুবিন্দু ‘বিদেশ‘। নৌকো এসে ভিড়ল ঘাটে। লাফ দিয়ে নামলাম মাটিতে। বুকের ভেতর কে যেন বলল, ‘তোমার পায়ে ঠেকাই মাথা‘। না, এটা তো আমার দেশ নয়। পাসপোর্ট ভিসা লাঞ্ছিত বিদেশ। ওপার? ওপারও তো আমার ঘর নয়। জন্মস্থান শিলং-এ আমি অবাঞ্ছিত ‘ড-খার‘ মানে বহিরাগত, আসামে বিদেশি, বাংলাদেশী।


গাড়ি এগিয়ে চলে হুহু করে সিলেটের দিকে। পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত একটির পর একটি গ্রাম, বাজার। কালীগঞ্জ, চারখাই, গোলাপগঞ্জ, বাঁ দিকে বেরিয়ে যাচ্ছে রাস্তা শ্রীচৈতন্যের ঢাকাদক্ষিণের দিকে। সিলেটে ঢুকতেই শেখঘাট, চৌহাট্টা, মিরাবাজার, বন্দর বাজার, শিবগঞ্জ। সব চেনা। একটা নামও অশ্রুতপূর্ব নয়। দেখছি, পড়ছি আর ভেসে উঠছে শৈশবের স্মৃতি। এই নামগুলি শোনার শৈশব। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান। ভীষণ চেনা একটা বিদেশ। যার সব জানি সব শুনেছি অথচ একটা বিদেশ। একে কোন সুরে বাঁধিব? মঞ্চে উঠতেই ভেতর থেকে কে যেন গেয়ে উঠল ‘রক্তে রেখে গেছে ভাষা/ স্বপ্নে ছিল যাওয়া আসা/ কোন যুগে কোন হাওয়ার পথে কোন বনে কোন সিন্ধুতীরে/ মন যে বলে চিনি চিনি/ যে গন্ধ বয় এই সমীরে কে ওরে কয় বিদেশিনী‘! অনুষ্ঠানের শেষে এসে গাইতে থাকি, ‘আমার শান্তির গৃহ সুখের স্বপন রে, ও দরদী কে দিল ভাঙিয়া/ মন কান্দে পদ্মার চরে লাইগ্যা‘। এই প্রথম গাইতে গাইতে চোখের জলে ভেসে যাই। গলা জড়িয়ে যায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রায় আড়াইশো ‘বিদেশি‘ শ্রোতা চোখের জলে ভেসে যেতে থাকে।


অনুষ্ঠান শেষ। রেস্টুরেন্টের অন্ধকার উঠোনে হঠাৎ জড়িয়ে ধরে অপরিচিত ‘বিদেশি‘ যুবক, অশ্রু ছলোছলো চোখে বলল, ‘দাদা, তুমি আমাদের কখনো পর ভেবো না। সিলেটকে বিদেশ ভেবো না। সাতচল্লিশে রাজনীতির খেলায় কী হয়েছে সে আমি জানি না। তখন তুমিও ছিলে না, আমিও ছিলাম না। এখন যখন পেয়েছি তখন আর দূরে ঠেলো না। এরপর থেকে যখন আসবে, ভেবো দেশে ফিরছি। সারা বছরের কর্মক্লান্তি থেকে বিরতি নিতে দেশবাড়িতে এসেছি‘!



আমার হারানোপ্রাপ্তির খাতাটা এমনই। চোখের জল, দীর্ঘশ্বাস আর বোকার মত আবেগের। এতে কোনো কা-জ্ঞান নেই!

সোমবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৬

আছে তাঁবু অন্তরে বাহিরে

এই দিনটা এলে কী করব ভেবে পাই না। আনন্দ? নাকি বিষাদ? জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই এই ধন্দেই চলেছে জীবন! এই দিনে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীর রক্তদানের মধ্য দিয়ে লালকেল্লা থেকে ইউনিয়ন জ্যাক নেমে তেরঙ্গা উঠেছিল, এটা তো কম আনন্দের নয়। সেই তেরঙ্গা আজকের কলঙ্কিত তেরঙ্গা নয়।কিন্তু আমি তো শুধু ভারতীয় নই, আমি বাঙালিও। আসামের তৎকালীন রাজধানী শিলং শহরে জন্মানো বাঙালি, যার মা বাবা সাতচল্লিশের এই দিনে নিজের ভিটেমাটি হারিয়েছে। মা বাবার প্রজন্মের ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা তো আমাকেও ছুঁয়ে আছে আজন্ম। তবে এই দিনটিকে কী করে আনন্দের দিন বলি!

মনে আছে প্রতি বছর এই দিনটা এলে বাবা একটি গল্প বলত। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। বাবা তখন আসামের জোরহাট শহরে। বাবা আর বাবার প্রাণের বন্ধু বীরেন সন্ধেবেলা পায়চারি করছিলেন জোরহাট শহরের রাস্তায়। বীরেনকাকাও ছিলেন সিলেটের লোক। একটু বড়ো হয়ে জেনেছি বীরেনকাকা আমার নিজের কাকা নন এবং তিনি বাঙালিও নন। মনিপুরি। বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরি। তবে সিলেটেরই। বাবা আর বীরেনকাকা যখন সন্ধেবেলা পায়চারি করছে জোরহাট শহরের রাস্তায়, তখন চারধারে বাজি পুড়ছে, আলোর রোশনাই। দেশ স্বাধীন হয়েছে। মানুষ সেই স্বপ্নের স্বাধীনতা অর্জন উদযাপন করছে মহানন্দে।বাবা বীরেনকাকাকে বলল, ভাবতে পারিস বীরেন, দেশ স্বাধীন হয়ে গেলো! ব্রিটিশ সত্যি সত্যি এ দেশ ছেড়ে চলে গেল! এখন আমরা স্বাধীন! আমরা কি কখনো ভেবেছিলাম, ব্রিটিশ সত্যি সত্যি এ দেশ ছেড়ে চলে যাবে? এই কথার উত্তরে বীরেনকাকা বলেছিল, দেশ স্বাধীন হল ঠিকই, কিন্তু আমাদের সিলেটটা বিদেশ হয়ে গেল! একথা শোনার পর বাবাও স্তব্ধ হয়ে যায়। দুজনে নীরবে আরো কিছুক্ষণ পাশাপাশি অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে থাকে। একটা লাইটপোস্টের কাছাকাছি আসতেই আবিষ্কার করে, দুজনেরই চোখ দিয়ে অঝোরে নেমে আসছে অশ্রু। প্রতি বছর পনেরো আগস্ট এলে আমার বাবা এই গল্পটা দিনের কোনো না কোনো সময় একবার অন্তত বলে উঠতোই। বাবার এই ঘোরলাগা স্মৃতিকাতরতা আমাকে ছুঁয়ে আছে আজও। ‘আমার মন কান্দেরে পদ্মার চরের লাইগ্যা‘ গানটা গাইতে গেলেই বাবার ওই গল্প মনে পড়ে। প্রিলিউডের মত প্রতিটি আসরে ওই গানটি গাইতে গেলে আমি অবধারিতভাবেই বাবার গল্পটি বলি। আমার বাবাদের প্রজন্মের অনেকেরই ধারণা ছিল দেশভাগের ঘটনাটি একটি ক্ষণস্থায়ী ভ্রান্তিমাত্র। একটা অতিক্রান্তিকালীন পর্বে এক ধরনের বিকৃত উন্মাদনার শিকার হয়েছে মানুষ। এ কখনো স্থায়ী হতে পারে না। কিছুদিন পর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেলে দেশ আবার এক হয়ে যাবে। আমার মণিকাকাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমরা সাতচল্লিশে আসার সময় বাড়িটা বিক্রি না করে ওই হরিবাবুর জিম্মায় রেখে চলে এলে কেন? মণিকাকা বলল, আমরা ভেবেছিলাম দেশভাগটা একটা সাময়িক গণ্ডগোল। কিছুদিন গেলে মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। দেশটাও আবার এক হয়ে যাবে, আমরাও ফিরে যাবো সিলেটে। বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল মণিকাকা। নেতাজী থাকলে দেশটা ভাগ হত না।  আমি এটাও লক্ষ্য করেছি, আমাদের এপারের ভিটেহারা মানুষের একটা বড়ো অংশ সারাজীবন বিশ্বাস করেছেন, নেতাজী থাকলে দেশটা ভাগ হত না। অনেকেই প্রতীক্ষায় থাকতেন, নেতাজী আত্মপ্রকাশ করবেন। একবার নেতাজী আত্মপ্রকাশ করলেই ভারত-পাকিস্তান এক হয়ে যাবে। 

আমি যখন বড়ো হয়ে ভোটাধিকার পাবার বয়সে পৌঁছে গিয়েছি, তখনও আমার ভোটাধিকার প্রাপ্তি হয় নি। কারণ আসামে তখন নতুন ভোটার তালিকা তৈরি বন্ধ। দেশভাগের বলি হয়ে ওপার থেকে এপারে মানুষ এসে নাকি আমাদের রাজ্যের অস্তিত্ত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। সেজন্যেই এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন শুরু হল আমাদের রাজ্যে। ‘দেশ থেকে বিদেশীদের বিতাড়ণ করতে হবে। ভোটার তালিকায় লক্ষ লক্ষ বিদেশীদের নাম। এগুলো বাদ না দেওয়া অবধি নতুন ভোটার তালিকা তৈরি বন্ধ রাখতে হবে।‘ বছরের পর বছর চলল অবরোধ, বন্ধ্, স্কুল কলেজ বন্ধ। আমাদের পরীক্ষা শিকেয় উঠলো। দিকে দিকে বাঙালিদের হত্যা হচ্ছে। আমার দাদার বন্ধু, আমাদের নিজের দাদারই সমতুল ডাক্তার অঞ্জন চক্রবর্তী গুয়াহাটি মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে খুন হয়ে গেল। কী আশ্চর্য, আমার দাদা যখন এই খবরটি আমাকে দেয় তখন আমি আমাদের সংগঠন ‘দিশারী‘র মহড়ায় অসমীয়া গানই গাইছিলাম। জ্যোতিপ্রসাদের গান। দাদা ডাকল, তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়। অঞ্জনকে গুয়াহাটিতে খুন করেছে। মনে একবারও দ্বিধা এল না, যে আন্দোলনকারী ঘাতকদের হাতে অঞ্জনদা খুন হল ওরা অসমীয়াই। ওরা জ্যোতিপ্রসাদের গান গেয়েই মিছিল করে। তাঁর গানের পংক্তি দিয়ে দেওয়াল লেখে। এটা একটা অদ্ভুত পরিহাসই।

যখন আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা গান নিষেধ, প্রকাশ্যে বাংলায় কথা বললে হেনস্থা হওয়ার সম্ভাবনা, যখন আনন্দবাজার পত্রিকা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে গোটা উপত্যকায়, যখন খুন হয়ে গেলেন অঞ্জন চক্রবর্তী, রবি মিত্ররা, তখন আমরা শিলচরে অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠানে শুরুতে গাইতাম জ্যোতিপ্রসাদের ‘মোরে ভারতরে মোরে সপোনরে চিরসুন্দর সংস্কৃতি‘। আরও কত কত গান। প্রকৃতপক্ষে ওই সময়পর্বেই সবচেয়ে বেশি অসমীয়া গান গেয়েছি। একবারও মনে হয় নি কেন গাইব এই গান। আমাদের অনুষ্ঠানগুলিতে ভরা অডিটোরিয়ামে কোনো কোণ থেকে একজন মানুষও কখনো আপত্তিকর মন্তব্য করে নি একটিও। আসামের প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী সমাজচিন্তক সুজিৎ চৌধুরী বলেছিলেন, উত্তর পূর্ব  ভারতে যারা ১৫ আগস্ট বা ২৬ জানুয়ারি এলে কালো পতাকা তোলে, যারা নিজেদের ভারতীয় বলতে অস্বীকার করে, যারা ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয় হাতে, রাষ্ট্রের চোখে তাঁদের ভারতীয়ত্ব প্রশ্নাতীত। আর, আমরা যারা ১৫ আগস্ট নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়েছি। যারা এপারে এসেও প্রতি পদে পদে সয়ে চলেছি বৈষম্য, অপমান এবং তারপরও ১৫ আগস্ট ২৬ জানুয়ারি এলে যারা নিষ্ঠাভরে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি, লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে ‘বল বল সবে শতবীণাবেণুরবে‘ ‘জনগণমনঅধিনায়ক‘ গাই, তাদের নাগরিকত্ব প্রতি মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে। তাঁদের তাড়ানোর জন্যেই বারবার দাঙ্গা হয়। কখনো বঙ্গাল খেদা নাম নিয়ে, কখনো বিদেশী বিতাড়ণ নাম নিয়ে, আবার কখনো বাংলাদেশী বিতাড়ণ নাম নিয়ে। তাদের তাড়াতেই সারাদেশে একমাত্র আসামে চলছে নাগরিকপঞ্জীর নবায়ন। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ নাগরিকত্ব হারানোর মুখে দাঁড়িয়ে।

যে দেশ ছিল পূর্বপুরুষের তা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে বিদেশি হয়েছে। যে রাজ্যে জন্মেছি সেখানে আমার কোনো অধিকার নেই। যে রাজ্যে বড়ো হয়েছি সেখানে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে গিয়েও পদে পদে বাধা। আমি তখন রাজনৈতিক কর্মী। ভোটে প্রচার করি, বুথে এজেন্ট থাকি, কিন্তু আমার ভোটাধিকার নেই। তখন ভোটাধিকারের বয়স ছিল ২১। আমার বয়স যখন ২৮, তখনই সুযোগ এলো ভোটার তালিকায় নাম তোলার। কারণ এর আগে সমস্ত নির্বাচন হয়েছে ১৯৭৯ সালে তালিকা অনুযায়ী।  যেহেতু আন্দোলনকারীরা বলেছিলেন বিদেশী বিতাড়ণ না করে নতুন তালিকা তৈরি হবে না। শুধু আমার জন্মের সনদ দিয়েই আমার নাগরিকত্ব চূড়ান্ত হবে না। হাতের কাছে প্রমাণ রাখতে হবে ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় আমার পিতামাতার অন্তর্ভুক্তির। আমার বাবার ১৯৬২ সালের ভারতীয় পাসপোর্টও তখন প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য হল না। নাছোড়বান্তা নির্বাচনী আধিকারিক বললেন, আমার কাছে নির্দেশ ৬৬ সালের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকার প্রমাণ ছাড়া নাম তালিকাভুক্ত করা যাবে না। ৬৬ সালে আমরা থাকতাম আসামের পশ্চিমপ্রান্তের শহর ধুবড়ীতে। তার মানে আমাকে ধুবড়ীতে গিয়ে দিনের পর দিন নির্বাচনী দপ্তরে ঘুরে ভোটার তালিকার প্রত্যায়িত প্রতিলিপি সংগ্রহ করতে হবে। নচেৎ ভোটার তালিকায় নাম উঠবে না। আসামে ভোটার তালিকায় নাম না থাকা মানে বিদেশী ঘোষিত হওয়ারই নামান্তর। ভাগ্যিস, ঘরে খুঁজে পেয়েছিলাম ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে বাবার সরকারি দায়িত্বের একটি নথি। সেটা দিয়েই পার পেলাম। প্রথমে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না আধিকারিক। আমি যখন তাঁকে বললাম, কোনো বিদেশী নাগরিক ১৯৬৭ সালের ভোটে জোনাল অফিসারের দায়িত্বে থাকা সম্ভব কি না, তখনই রাজি হলেন।

১৯৭২ সালে আমরা সপরিবারে একবেলার জন্যে সিলেট গিয়েছিলাম। বাবার ছিল সরকারি কাজ। আমরা তাঁর সঙ্গ নিয়েছিলাম। ঘটনাচক্রে সেদিনই বাংলাদেশে গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। দুপুরবেলা আমরা যখন সিলেট শহরের এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি তখন রেডিওতে ভেসে আসছিল ঢাকার রমনা ময়দানের ইন্দিরা গান্ধীর জনসভার ধারাবিবরণী। মা আর বাবার সাথে সারাদিন তাঁদের বাড়ি, স্কুল, কলেজ, এক কথায় তাঁদের অতীতে ভ্রমণ সেরে রাতে যখন আমরা সীমান্ত অতিক্রম করছি, তখন দাদা বলল, আমরা বিদেশ থেকে এখন স্বদেশে ঢুকছি। মা অস্ফুট স্বরে বলল, স্বদেশ বিদেশ আমার গুলিয়ে গেছে। কোথায় গিয়েছিলাম, আর কোথায় ফিরলাম, আমি জানি না। মা‘র অস্ফুটস্বরে বলা সেই কথাটা সেই কিশোরবেলা থেকে এখনও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।

পরে ১৯৯৯ সালে আবার সিলেট গেলাম। বলা যায়, ১৯৯৯ সাল থেকে সিলেট যাচ্ছি। এর আগে ভারত সরকারের একটি বিশেষ নিয়মের জন্যে সিলেট বা বাংলাদেশের মানুষ এখানে আসতে পারতেন না সহজে। ভারতের উত্তর পূর্ব অঞ্চলে কোনো বিদেশি নাগরিককে আসতে হলে ভিসা ছাড়াও রেস্ট্রিক্টেড এরিয়া পারমিট নিতে হত দিল্লি থেকে। সে এক বিষম হ্যাঁপা। ফলে যোগাযোগ না থাকায় আমরাও তাঁদের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পাই নি। এখানে ইন্দ্রকুমার গুজরাল ও ওপারে শেখ হাসিনার সরকার আসার পর আমাদের দুপারে যাতায়াত সহজ হল।১৯৯৯ সালে সিলেটে গিয়ে প্রথম দিন মদনমোহন কলেজে একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে পরিচয় হল সেখানকার গণশিল্পী ভবতোষ চৌধুরীর সাথে। পরিচয়পর্ব শেষ হতেই বললেন, এসেছেন পূর্ব পুরুষের ভিটে দেখতে? পুকুরটা একই রয়েছে কি না? নারকেল গাছটা যেমন ছিল তেমন রয়েছে কি না, তাই দেখতে তো? না, এদেশে আপনাদের কোনো অধিকার নেই। ল্যাজ তুলে আপনাদের বাপ ঠাকুরদারা পালালেন। আমরা এদেশে থেকে যাওয়া হিন্দুরা এদেশের মুসলিম ভাইদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একুশের লড়াই লড়েছি, রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে লড়েছি, স্বাধিকারের সংগ্রাম করেছি, মুক্তিযুদ্ধ লড়েছি, বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর একসাথে দুর্দিনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছি, এরশাদ বিরোধী লড়াই লড়েছি, পাকিস্তানের চিহ্ন মুছে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে এনেছি। এখন আপনি এসেছেন নারকেল গাছ আর পুকুর দেখতে। না, আপনার আবেগ আমাকে ছোঁয় না। প্রথমটায় হতভম্ব হয়ে গেলাম। কোনো কথাই মুখ দিয়ে বেরোল না। পরে চিন্তা করে দেখলাম, এটাও তো একটা দৃষ্টিকোণ যার সাথে আমাদের কোনো পরিচয়ই নেই। ভবতোষদা যা বললেন, এটাও একটা সত্য যা আমি কখনো ভাবি নি।

মনে পড়ল, শিলচরে একবার আমাদের সংস্থায় অনুষ্ঠান করতে এসেছিলেন বাংলাদেশের শিল্পী সাদী মহম্মদ ও শম্পা রেজা। ওরা যেদিন ফিরে যাবেন সেদিনই সকালেই জানলাম শম্পা আমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সিলেটের যুগভেরী পত্রিকার সম্পাদক আমিনুর রশিদ চৌধুরীর পুত্রবধু। বাবার কাছে আমিনুর রশিদ সাহেবের অনেক গল্প শুনেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় শিলচর এসে তিনি বাবার সাথে দেখাও করেছিলেন। তারপর থেকে অনেক বছর অবধি ডাকে আমাদের বাড়িতে যুগভেরী পত্রিকা আসত। কথা সূত্রেই জানলাম শম্পার বাবারা ছিলেন মুর্শিদাবাদের লোক। কলকাতায় পার্ক সার্কাস অঞ্চলে ওদের একটা বাড়ি ছিল। দেশভাগের সময় সেই বাড়ি ঢাকার কোনও এক হিন্দু পরিবারের সাথে বিনিময় করেছেন তাঁরা। শম্পার ও দেশভাগ নিয়ে আমার মতই আবেগ। বললেন, শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় কলকাতায় এলেই পার্ক সার্কাসের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেন। কল্পনা করতেন, বারান্দা দিয়ে তাঁর দাদী হেঁটে যাচ্ছেন। সাদীদের পরিবার পূর্ববঙ্গীয় মূলের। ফলে দেশভাগের ফলে তাঁদের কোনো স্থানান্তর হয় নি। আমার আর শম্পার কথা শুনে সাদী বললেন, ১৯৪৭ সালে শম্পার আব্বারা যদি পার্ক সার্কাস ছেড়ে ঢাকা না আসতেন, কিংবা আপনার বাবা মায়েরা যদি সিলেট ছেড়ে ভারতে চলে না যেতেন, তবে কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়ার জন্যে আমাদেরকে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অবধি অপেক্ষা করতে হত না। আরো আগেই আমরা দ্বিজাতি তত্ত্বের অন্ধগলি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের জন্ম দিতে পারতাম। সিলেটে ভবতোষদার ষ্পষ্ট কথাটি সরাসরি শুনে আমার আবার সাদীভাইয়ের মুখে শোনা কথাই মনে পড়ল। এই সত্যটি আমাদের এপার থেকে কখনোই অনুভব করা যায় না। ফলেই এই কথাগুলি আমরা কখনো ভাবি নি। মায়ের মুখেই শুনেছিলাম। সিলেটে মায়ের অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিলেন হোসনে আরা বেগম। গণভোটের সময় দুজনের একটু খানি দূরত্ব তৈরি হয়েছিল তাঁদের দুজনের মধ্যে। কারণ মায়েরা ছিল সিলেটের ভারতভুক্তির পক্ষে প্রচারে। হোসনে আরা বেগমেরা ছিলেন পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে। পরে সিলেট যখন সত্যি সত্যি পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হল এবং আমার মায়েদের এপারে চলে আসতে হল, তখন আসার সময় মা‘কে জড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন হোসনে আরা। মা বলত, হোসনে আরা কেঁদে বলল, আমরা ভেবেছিলাম পাকিস্তান মানে বাড়তি কতগুলি সুযোগ সুবিধা, কতগুলি না পাওয়া অধিকার। পাকিস্তান মানে দুই বন্ধুর জন্যে দুটি দেশ, এটা যদি বুঝতাম তবে বোধহয় পাকিস্তান চাইতামই না। তবু পাকিস্তান হল। আমার মায়েরা এদিকে চলে এল। ওপারে চলে গেলেন শম্পার বাবা মায়ের মত কলিম শরাফী হাসান আজিজুল হকেরা। তবে ওরা ভিটে হারালেও ওপারে পেয়েছেন অকুন্ঠ সম্মান। উত্তর পূর্ব ভারতের বাঙালির মত জীবন অভিশপ্ত হয়ে ওঠে নি। ভিটের বদলে পেয়েছেন একটি দেশ।

আমার কী কোথাও আদৌ দেশ আছে। শিলং-এ আমরা ডখার, বহিরাগত। আসামে বাংলাদেশী। কলকাতায় বাঙালি, ভারতীয়, তবে বাঙাল। এমএসসি ক্লাসে বর্ধমানে আমার পাশে বসা আমার সহপাঠী ববি যে কথাটা বলেছিল সেটাও কোনো দিন কি ভুলতে পারি। ববি বলেছিল ভালোবেসেই। কিন্তু সে ভালোবাসাটা তীরের মত বিঁধে আছে সেই থেকে। বলেছিল, শুভ, তুই বাঙাল হলেও বাঙালদের মত নোস। তুই খুব ভালো, অন্যরকম। ববিকে বিষয়টা বোঝাতে আমি বললাম, তার মানে আমার বাবা মা কাকা কাকী আমার পরিজন স্বজন সক্কলেই খারাপ, শুধু আমি ভালো? এই প্রশংসাটা কী করে নিই বল্? অবিচলিত ববি বলল, তুই সেন্টিমেন্টাল হোস না। বাঙালরা সত্যি তোর মত না। কী চেঁচিয়ে কথা বলে। সর্বক্ষণ ঝগড়া করে। পাড়ায় একটা বাঙাল যদি ভাড়া আসে, দশ বছর পর দেখবি গোটা পাড়াটা বাঙাল হয়ে গেছে।

১৫ আগস্ট এলে এসব কথা ঘুরে ফিরে মনে পড়ে। এমনিতেও দেশপ্রেম কথাটায় আমার খুব অস্বস্তি হয়। বাংলাদেশ এবং আমাদের দেশে বিষয়টা ঠিক উল্টো। বাংলাদেশে দেশপ্রেম বিষয়টা একটা ইতিবাচক অবস্থান। কারণ সেখানে মৌলবাদী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা একটি ধর্মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্বের কথা বলে দেশপ্রেমের প্রতিকল্পে।সেই অবস্থান থেকেই তারা প্রত্যাখান করে একুশ, একাত্তরকে। আমাদের দেশে উল্টো। এখানে ধর্মকে জাতির সাথে একাকার করে এক বিকৃত জাতীয়বাদ ও জঙ্গী দেশপ্রেম হাজির করা হয় আন্তর্জাতিকতাকে প্রত্যাখান করতে। যদিও বিশ্বায়নে এই গৈরিক জাতীয়তাবাদের আপত্তি নেই। আপত্তি সাধারণ মানুষের আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্যে।আমার কাছে দেশ মানে সেই মাটি যেখানে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা থাকে। বিদেশ-বিদ্বেষের মুখরিত দেশপ্রেমে আমার কোনো আস্থা নেই।

আজ যখন নরেন্দ্র মোদীকে দেখি লালকেল্লা থেকে ভাষণ দিতে তখন মনে পড়ে ১৯৯৭ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রকুমার গুজরালের ভাষণ। গুজরালই ভিটেহারা জনগোষ্ঠী থেকে আসা এদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। গুজরালের সেদিনের বক্তৃতায় ১৯৪৭ সালের আমার বাবা এবং বীরেনকাকাকে খুঁজে পেয়েছিলাম। গুজরাল বলেছিলেন, আজ থেকে ৫০ বছর আগে যখন আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, সেদিন আমাদের এক চোখে ছিল আনন্দের উচ্ছাস। আর অন্য চোখে ছিল বিষাদের অশ্রুজল।

এক চোখে আনন্দ আর অন্য চোখে বিষাদ নিয়ে ফিরে ফিরেই আসে ১৫ আগস্ট। বুকের ভেতর একটা অন্তর্লীন আশঙ্কা নিয়েই আমাদের বাঁচা।আবার কোনো রাজনীতির ঘুঁটি চালাচালিতে আমরা ভিটেহারা হব না তো? যে মাটিকে নিজের ভেবে নিয়েছি, কোনো এক র‌্যাডক্লিফ এসে পেনসিলে টানে সে মাটিকে বিদেশ বলে ঘোষণা করবে না তো? এজন্যেই কি প্যালেস্তাইনের নাটক দেখে আমার চোখে নেমে আসে আমার বাবা মায়ের প্রজন্মের অশ্রু?


আমাদের ঘর নেই। আছে তাঁবু অন্তরে বাহিরে।

রবিবার, ৮ মে, ২০১৬

কথার কথা

আগুণঝরা দিনের শেষে দগ্ধ-আমি বাড়ি ফিরি। একটু শীতল হাওয়ার জন্যে ভেতর ও বাহির অস্থির হয়ে ওঠে। ঘরে ঢুকে ফ্যানের সুইচ অন করতেও সেই গরম হাওয়ারই ঝাপট লাগে সারা অঙ্গে। না হাওয়ায় কোনো শুশ্রুষা নেই। অগত্যা মন ঘোরাতে টিভির নব ঘোরাই।যদি একটি গানের কলি বা নিদেন পক্ষে একটি সুর কিংবা কিছু ভালো লাগায় ভাসিয়ে দেওয়া দু’চারটি কথা শুনি। আলো গিয়ে পড়ে সরাসরি এক সংবাদ ও ভাষ্যের চ্যানেলে। সেখানে তখন ভেসে ভেসে উঠছে একটি ব্রেকিং নিউজের চাঞ্চল্যকর উপস্থাপনা। পেছনে মানানসই আবহসঙ্গীত। একটি শিশুর শরীরে ভেসে ওঠা আঘাতের চিহ্নের ছবি ভেসে ভেসে ওঠে পর্দায়। বড়দের রাজনীতির দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কোপ থেকে বাঁচে নি এই শিশুটিও। একটু পরেই শুরু হয় আলোচনার প্রহর। আলোচনা বা বিতর্কের কি কোনো সুযোগ আছে এখানে? এমন একটি জঘন্য পাশবিকতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে সবাই! 

হঠাৎই যেন অনুভব করি দুপুরের খররোদের দহন। আমার শ্রবণজুড়ে ঝাপটাতে থাকে তপ্তহাওয়ার ঝড়। এই পাশবিকতারও তবে রঙ আছে? এই হিংস্রতারও তবে একটি এ-পক্ষ ওপক্ষ রয়েছে? তার মানে আমাদের সমস্ত কথাই কি পূর্ব নির্ধারিত। শুধু মাত্র উপলক্ষ্য বদলে বদলে যায়! বিশ্বব্রহ্মা- এদিক ওদিক হলেও এই সান্ধ্য আলোচনায় কোলাহলটিই শুধু একমাত্র সত্য? কার কন্ঠস্বর কীভাবে চাপা দেওয়া যাবে তারই বুঝি শিল্পিত উপস্থাপনা পর্দা জুড়ে? এই চীৎকৃত উল্লাস ও ক্রোধ- এর বাইরে বুঝি এই পৃথিবীতে কোনো কান্না নেই, মৃদু হাসি নেই, ¯িস্নগ্ধতায় ¯স্নাত করে দেওয়ার মত সুবাতাস নেই। এই দানবীয় হুঙ্কার থেকে রেহাই পেতে হঠাৎ আঙুলের চাপ পড়ে মিউট বোতামে। শব্দহীন দৃশ্যপট যেন আরো বীভৎস করে দেয় সবকিছুকে। না, সব বন্ধই করে দিতে হবে! 

বারান্দায় এসে দাঁড়াই। দূরে আকাশে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে একটি দু’টি তারা। বুকের ভেতর থেকে হঠাৎই জেগে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ। কে যেন গেয়ে ওঠে, ‘যারা কথা দিয়ে তোমার কথা বলে/ তারা কথার বেড়া গাঁথে/ কেবল দলের পরে দলে‘। তার মানে সেই কবেই বুঝি ‘কথা দিয়ে‘ কথা বলায় বিতৃষ্ণ হয়েছিলেন কবিগুরু! শব্দহীন টিভির পর্দাটা স্মৃতিতে ভেসে ওঠে, আর গান জেগে ওঠে, ‘একের কথা আরে/ বুঝতে নাহি পারে/ বোঝায় যত কথার বোঝা তত বেড়েই চলে‘। এ যেন এ রাজ্যেরই ধারাবিবরণী! রাজ্য কেন, এই সমসময়ের পৃথিবী নয় কি? যেখানে সর্বক্ষণ চলে শুধু কথার চাতুরি কিংবা চীৎকৃত উল্লাস! কিন্তু কথারও একটা সাহিত্য রয়েছে, কথা ছাড়া কবিতারই বা জন্ম হবে কী করে! কথাকে বর্জন করতে বলছেন কবিগুরু? তবে মুক্তি কোথায়? গানের সঞ্চারী যেন উত্তর নিয়ে বসেই ছিল।

‘যারা কথা ছেড়ে বাজায় শুধু সুর/ তাদের সবার সুরে সবাই মেলে নিকট হতে দূর‘! সুরে? সঙ্গীতে? গীতে? তবে যে প-িতেরা বলেন কবিতার সমাজে গীতি কবিতারা তুলনায় তরলতর সৃষ্টি। উচ্চ সাহিত্যের পদবাচ্য নয় তারা। সত্যিই কি তাই? রবীন্দ্রনাথ বলছেন একটি প্রসঙ্গে, সাহিত্যে সঙ্গীতের প্রয়োজন কতটা? তাঁর মতে যে সাহিত্যে সঙ্গীত নেই তা সাহিত্যই নয়। সাহিত্যে সঙ্গীত থাকা বাঞ্ছনীয়। সঙ্গীতই সাহিত্যকে সাহিত্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। তার মানে যে কথায় সুর নেই তা কথাই নয়? ওই যে উচ্চকিত কথার ¯্রােত চার পাশকে তপ্ত করে, দগ্ধ করে, তাতে আর যাই থাক সুর নেই। বুকের ভেতর বেজে যায়, ‘যারা কথা ছেড়ে বাজায় শুধু সুর/ তাদের সবার সুরে সবাই মেলে নিকট হতে দূর/ বোঝে কি নাই বোঝে থাকে না তার খোঁজে/ বেদন তাদের মেলে গিয়ে তোমার চরণতলে‘। বারবার বেজেই যায়, ‘যারা কথা ছেড়ে বাজায় শুধু সুর...‘।

চেন্নাইয়ের হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে মা। দূর থেকে দেখি তামিল আয়া মেয়েটি মায়ের সাথে হাত নেড়ে কথা বলে চলেছে। কখনো হেসে, কখনো একটু গম্ভীর, কখনো করুণ চোখে। মা-ও উত্তর দিয়ে যাচ্ছে, নতুন প্রসঙ্গের অবতারণা করছে। কখনো দুজনের হাসি মিলছে কথোপকথনে, কখনো দুজনের করুণ আঁখিতে জেগে উঠছে একই অশ্রুবিন্দু। দূর থেকে দেখি, শুনি না কিছুই। বিস্ময় জাগে, এখানে আয়ারাও ভালো হিন্দি বা ইংরেজি বলে তবে। সে জন্যেই মা পেয়ে গেছে ভিজিটিং আওয়ার পেরিয়ে যাওয়ার পরও কথার সাথি। সামনে এসে ঘোর ভাঙে। মেয়েটি কথা বলে চলে বিশুদ্ধ তামিলে। মা নিজের বহুভাষিকতার সর্বস্ব দিয়ে কখনো বাংলা কখনো মায়ের পরীক্ষা পাশ করা অথচ দুর্বল কথ্যের হিন্দি, কখনো ইংরেজিতে। আমি অবাক, মা পরিচয় করিয়ে দিল, আমার ছেলে। উত্তরে এক গাল হেসে কুশল জিজ্ঞেস করল মাতৃভাষাতেই সেই আয়া। মা’কে বললাম, এভাবেই বুঝি তোমাদের বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে? কেউ কারো কোনো কথা না বুঝে? মা বলে, অত বোঝার কী আছে? খুব ভালো মেয়েটি। বুঝি, ওর স্বাভাবিক ভালোত্বটাই হচ্ছে মায়ের সাথে তার সংযোগ ভাষা। এটাই কি কথার গভীরে থাকা সুর যা সর্বত্রগামী। এটাকেই কি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন সাহিত্যের সার্থকতার জন্যে অবশ্য প্রয়োজনীয় সঙ্গীত?

তোমার চরণতলে! যারা বিশ্বাসী তাদের জন্যে তোমার মানে তো ঈশ্বরই। যে নিরীশ্বর, আমার মতো? এই তুমি হচ্ছে জীবন, আবহমান জীবন, আমার ঘিরে থাকা বিশ্ব, তার প্রাণ, যার সুরে সুর মেলাতে আমার বেলা যায় সাঁঝ বেলাতে। কাছের সুরের একতারার একটি তারের ধ্বনিতে সেই বেজে ওঠে না। বিশ্বসঙ্গীতের ‘সহস্র দোতারা’ বেজে ওই সঙ্গীতে যেখানে দূর হয় নিকট, নিকট হয় চিরকালের। ‘যারা কথা ছেড়ে বাজায় শুধু সুর..‘। না, এটা সুরকে ধরতে চেয়ে কথাকে বর্জন করার কথা নয়। আমরা নিশ্চয়ই চাই না, কথা আর সুর চিরবিরহে থেকে যাক সমান্তরালে। চাই এমন কথা যা বেজে ওঠে সুরে, চাই এমন সুর যে এক গভীর গভীরতর কথা বহন করে।
পাশের বাড়ির টিভি থেকে অন্ধকার বারান্দায় ভেসে আসে হট্টগোল, সিরিয়ালের। হয়ত সংবাদ কিংবা ভাষ্যের অনুষ্ঠানেরই। একই রকম শোনায় যে দুটো, ধন্দ লেগে যায়!
‘তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না করে শুধু মিছে হলাহল
সুধাসাগরের তীরেতে বসিয়া পান করে শুধু হলাহল‘।

শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৫

যিনি স্পর্ধা শিখিয়েছেন!

তিনি আমাদের রাজনীতির শিক্ষক, একথা বললে তাঁর সম্মান বাড়ে না। বাড়ে আমাদেরই। কারণ তাঁর মত একজন নিবেদিতপ্রাণ ত্যাগী সৎ রাজনৈতিক নেতাকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েও আমরা উচ্চতায় তাঁর ধারে কাছেও আসতে পারলাম না। আজ দুপুর সাড়ে বারোটায় দেশহিতৈষীর সন্দীপ দে প্রথম ফোন করে দিলেন দুঃসংবাদটি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটে বেরিয়ে স্টেশনের দিকে ছুটলাম। তাড়াতাড়ি কলকাতা পৌঁছতে হবে। সারা রাস্তা জুড়ে গত ৩৬ বছরের আমার রাজনীতির জীবনের নানা সময়ের ঘটনাগুলি ছবির মত ছুটে বেড়াচ্ছে চোখের সামনে। বারবারই মনে মনে বলছি, তিনি আমার শিক্ষক। তারপর বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠছে। এই কথা বললে নূরুলদার তো সম্মান বাড়বে না। কারণ তাঁর জীবন থেকে কিছুই নিতে পারলাম না আমার জীবনে। তাঁকে শিক্ষক বলার কতটাই বা যোগ্যতা রয়েছে আমার!


১৯৭৯ সাল। সারা আসামে বিদেশি বিতাড়ণ আন্দোলন শুরু হয়েছে। আমার দিদি ও মাসতুতো দাদা তখন গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এবং সেখানে সক্রিয়ভাবে এসএফআই করে। দাদা দিদিদের অনুপ্রেরণায় এসএফআই-এর সদস্য হয়ে গেলাম। তারপর থেকেই নাজিরপট্টির দোতলায় যাতায়াত শুরু হল। ১৯৭৯ সালের পুজোর ছুটির দিনে গোপেনদা কাঠের আলমারি থেকে বের করে আমার হাতে তুলে দিলেন পার্টি কর্মসূচি। তার কিছুদিন আগেই ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের সালকিয়াতে পার্টির প্লেনামে ঠিক হয়, পার্টিতে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে প্রার্থী সদস্যপদ ও পূর্ণ সদস্যপদের আগে প্রাথমিক একটি স্তরকে অন্তর্ভুক্ত করার। তখনই পার্টি বা গণসংগঠনের সক্রিয় কর্মীদের প্রথমে এ,জি (তখন বলা হত অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ, এখন বলা হয় অক্সিলিয়ারি গ্রুপ)-এ অন্তর্ভুক্ত করে কর্মীদের রাজনৈতিক শিক্ষা প্রদানের একটি স্তর অতিক্রম করে প্রার্থী সদস্যপদ প্রদান করা। এর আগে এ,জি ব্যাপারটা যেমন ছিল না, ঠিক তেমনি পার্টিতে সদস্যপদ পাওয়াটাও অত্যন্ত কঠোর ছিল। সালকিয়াতে তা খানিকটা লঘু করা হয় সঙ্গে একটি বাড়তি স্তরকে যোগ করে। ১৯৭৯ সালের পুজোর পরপরই শিলচরের প্রথম পার্টি এ,জিতে আমি এবং আরো কয়েকজন ছাত্রকর্মী অন্তর্ভুক্ত হলাম। তখন শিলচরের পার্টি লোকাল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন নূরুলদা। আমাদের নিয়ে বসতেন নূরুলদাই। নূরুলদা আমার পরিবারের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন এর আগেই। আমার মেসো এবং কাকা ছিল তাঁর যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বন্ধু।


কলেজে তখন আমার সহপাঠি, বন্ধু দেবাশিসের নেতৃত্বে ডিএসও এবং বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য ও পার্বতী পালের নেতৃত্বে আরওয়াইএসএল নামের নকশালপন্থী ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় কর্মকাণ্ড ছিল। মিঠুদা (পার্থপ্রতিম মৈত্র), তীর্থঙ্কর দা (চন্দ) এবং এখন এই শহরের বিশিষ্ট চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট অরিন্দম ভট্টাচার্যরা সকলেই আরওয়াইএসএল করত। লুকুদার চায়ের দোকানে প্রতিদিন চলত দেবাশিস ও বিশ্বনাথদার তাত্ত্বিক তর্ক। তিন দুনিয়ার তত্ত্ব, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ একদিকে এবং অন্য দিকে ভারতের একমাত্র সাম্যবাদী দল, শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার তর্ক। আমি এসএফআই-এ যোগ দিতেই এর সাথে যুক্ত হল ভারতে সামন্ততন্ত্র রয়েছে কিনা, জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব না সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব- বিষয়ক তর্ক। রাজনীতিতে আমি নতুন, দেবাশিস পুরোনো। ফলে দেবাশিস প্রতিদিন এক একটি কথা বলে আমাকে ঘায়েল করত, আর আমি উত্তর খুঁজতে পার্টি অফিসে গিয়ে নূরুলদাকে প্রশ্ন করতাম। নূরুলদা একটা একটা করে বিষয়গুলি বুঝিয়ে দিতেন। পরে এ,জি সভার আগে বলতেন, তোর প্রশ্নগুলো লিখে আনিস। আমি আগে থেকে প্রশ্নমালা তৈরি করে তাঁর হাতে তুলে দিতাম। নূরুলদা ধৈর্যের সাথে সেগুলো পড়ে উত্তর দিতেন। কখনো বলতেন কোনও একটি বই পড়ে নিতে সঙ্গে। তখন দেশহিতৈষী পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে পার্থ ঘোষের ‘সমাজতন্ত্র কী কেন কোন পথেশিরোনামে একটি ধারাবাহিক প্রকাশিত হত। আমার রাজনীতির হাতেখড়িতে এই ধারাবাহিকের অবদানও অপরিসীম। চীনে তখন বিরাট অদলবদল চলছে। সেই নিয়ে পিপলস ডেমোক্রেসিতে প্রকাশিত বাসবপুন্নাইয়ার নানা নিবন্ধের অনুবাদ প্রকাশিত হত দেশহিতৈষীতে। সেগুলোও প্রতি সপ্তাহে গোগ্রাসে গিলতাম। আমাদের এ,জি সভা বা পার্টি ক্লাসে নূরুলদা সেই প্রবন্ধগুলির প্রসঙ্গও আনতেন। নূরুলদাকে আমরা ভয় পেতাম ঠিকই, কিন্তু সে সময় থেকেই তার সাথে অবলীলায় তর্কে মেতে উঠতে পারতাম। এই সম্পর্ক তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়ার পরও অব্যাহত থেকেছে। পশ্চিমবঙ্গের কমরেডদের জন্যে এই ব্যাপারটা প্রায় অকল্পনীয়। এখানে জোনাল সম্পাদক ঘরে ঢুকলেই সাধারণ পার্টি সদস্যদের গল্পগাছা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের শিলচরে পার্টির অভ্যন্তরের পরিবেশটা অনেকটাই ব্যতিক্রমী ছিল। এক বছর পর যখন আমি পার্টির প্রার্থী সভ্যপদ পাই তখন আমার বয়স আঠারো পূর্ণ হতে কয়েকমাস বাকি। নূরুলদার মুখস্থ ছিল আমার জন্মের সন তারিখ। ফর্ম ফিলাপ করার সময় তিনি হেসে বললেন, তোর তো এখনও আঠারোই হয় নি রে। এখনও তিন মাস বাকি। আমার ফর্মে ছিল তাঁরই স্বাক্ষর।


এখন নূরুলদা নেই। এসব ভাবতে ভাবতে অজানা গর্বে বুক ভরে ওঠে, আর চোখের কোণে আচমকাই নেমে আসে অশ্রুবিন্দু। নিজের প্রতি ধিক্কারই হয়! আমার রাজনীতির জীবনে আলো ফেলে গেছেন গোপেনদার মত আন্দামানে দ্বীপান্তরিত বিপ্লবী, দিগেন দাশগুপ্তের মত বিপ্লববাদী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সুরমা উপত্যকার প্রথম কমিউনিস্টদের একজন, অচিন্ত্যদার মত ক্ষুরধার মেধার জননেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। কাছে পেয়েছি চানবাবু সিংহ, মনীষ ভট্টাচার্য, রুক্মিণী আচার্যের মত কৃষক নেতা, তেভাগার বীর সেনানী ভগীরথ সিংহ, সোনামনি সিংহ, কাশীরাম মুড়া, মজহর আলি, তৈয়ব আলিকে। কৃষক সভার সভাসমিতিতে ‘চাষী দে তোর লাল সেলামখালি গলায় গাইতেন উধারবন্দের নগরের কৃষক নেতা উপাসক নুনিয়া। তাঁর গাওয়া শুনেই শিখেছি এই গান। ‘মোদের চলার পথে পথে রক্তনিশান ওড়েকে উপ্সাদা গাইতেন ‘মোদের চলার পথে পথে লাল ঝাণ্ডা ওড়ে। আমার ভারি ভালো লাগত সেটি। আমিও এভাবেই গাই এখনও গানটা। কষ্ট হয়, যখন আবিষ্কার করি ওই রক্তপতাকার ওই বীর সেনানী আলোকিত ব্যক্তিদের আলোর এক ফোঁটাও জীবনে ধারণ করতে পারলাম না। যে পতাকা তারা বইবার জন্যে দিয়েছিলেন সেই পতাকা বইবার শক্তি বরাক উপত্যকায় আমি বা আমরা সকলেই ক্রমেই হারিয়েছি।


অনেক কথা ভিড় করে আসছে মনে। নূরুলদা কখনো কোত্থাও এক মিনিট দেরিতে যেতেন না। কেউ কোনো সভাসমিতিতে দেরিতে এলে প্রচণ্ড রাগ করতেন। এই কিছুদিন আগে অবধি হেঁটে চলাফেরা করতেই ভালোবাসতেন। তাঁর একটি হিসেব ছিল। সাড়ে তিন থেকে চার কিলোমিটারের দূরত্ব তিনি কখনোই রিক্সায় যেতেন না। এভাবেই ঝালুপাড়ার বাড়ি থেকে নাজিরপট্টির পার্টি অফিসে তিনি হেঁটে আসতেন প্রতিদিন। শিলচরের পুরোনো লোকেদের এই ছবিটি নিশ্চয়ই গাঁথা রয়েছে-  রাত্রি আটটা বা সাড়ে আটটার নাজিরপট্টির পথ দিয়ে প্রেমতলা উল্লাসকর সরণি হয়ে ঝালুপাড়ার দিকে হেঁটে বাড়ি ফিরছেন নূরুলদা ও ছবিদি। একমাত্র ইম্ফলে পার্টির কাজে গেলেই নূরুলদা প্লেনে যেতেন। গুয়াহাটি যেতেন রাজ্য সরকারি পরিবহনের তখনকার হতশ্রী বাসেই। দিল্লিতে কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় যেতেন স্লিপার ক্লাসের ট্রেনে। রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে প্রতি মাসে অন্তত দুবার তাঁকে যেতে হত গুয়াহাটিতে। কোনো কোনো মাসে আরো বেশি বার। সোনাপুর লাইড্রিমবাইয়ের ভাঙাচোরা রাস্তায় গ্রীষ্ম বর্ষা শীতে সবসময়ই তিনি যেতেন ওই বাসেই। ওই পথের ওই কষ্টের বাসযাত্রা করে শিলচরে বাড়ি ফিরেই ¯স্নান সেরে হয়ত বেরিয়ে পড়লেন লাইন বাসে চড়ে সোনাই বা ভাগাবাজার বা হাইলাকান্দিতে। ক্লান্তিহীন ছিলেন নূরুলদা। কেন্দ্রীয় কমিটির বড়ো দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে পার্টি পত্রিকার অনাদায়ী টাকা বাড়ি বাড়ি ঘরে সংগ্রহ করার কাজও করতেন। তখন নূরুলদাকে দেখলেই আমরা ভয় পেতাম তখন। কারণ দেখা হলেই, এই ব্যস্ততার মধ্যে ডায়েরির ভেতর থেকে বার করবেন তালিকা, কার এলাকায় গণশক্তি, দেশহিতৈষী বা পিপলস ডেমোক্রেসির কত টাকা অনাদায়ী পড়ে আছে। দিল্লি গুয়াহাটি ইম্ফল সোনাই ধলাই করার মধ্যেই নানা লোকের বাড়িতে বা অফিসে ঢুকে সংগ্রহ করে আনতেন অনাদায়ী টাকা। পরে দেখা হলে বলতেন, তোরা তিন মাস ধরে টাকাটা আনতে পারলি না। আমি তো যেতেই দিয়ে দিল।


তখন আমি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ছুটিতে বাড়ি এসেছি। ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে একটি সভা হবে শিলচরে। নূরুলদা আমাকে বললেন, ডায়েরিতে তারিখটা লিখে নাও। সেদিন থাকতে হবে, কয়েকটা গান করতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। উনি বারবার বললেন, ভুলে যাবি না কিন্তু। আমি বললাম, ভুলব কেন। পরের দিন নূরুলদা চলে গেলেন গুয়াহাটিতে, তারপর কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় দিল্লিতে। 

এই সময়ের মধ্যে একদিন করিমগঞ্জ থেকে তখনকার জেলা সম্পাদক শ্রীনিবাসদা চিঠি লিখে বলল, ওই দিনেই দুল্লভছড়াতে যুব ফেডারেশনের কমরেডরা একটি গানের অনুষ্ঠান করতে চায় আমাকে নিয়ে। টিকিট দিয়ে অনুষ্ঠান করে ওরা অর্থ সংগ্রহ করবে সংগঠনের জন্যে। আমি যেন অবশ্যই যাই। আমি তো জলে পড়লাম। নূরুলদা পইপই করে বলে গেছেন যেন ওই সভাটা মিস না করি। দুলালদাকে বললাম। ও বলল, সভার আগে দুটো গান গাওয়ার চেয়ে এই অনুষ্ঠানটা বেশি জরুরি। শ্রীনিবাস চিঠি লিখেছে। তুমি চলে যাও। আমি নূরুলদাকে বলে দেবো। উনি জানলে বিষয়টা বুঝবেন। আমি চলে গেলাম। এদিকে সভার দিন সকালবেলা নূরুলদা ফিরেছেন। সভায় এসেই নূরুলদা জিজ্ঞেস করলেন, শুভ কই। কে একজন বলল, ও তো দুল্লভছড়াতে ফাংশনে গেছে। শুনেই নূরুলদা অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। ‘আমি এতদিন আগে ওকে নোট করিয়ে রাখলাম, আর ও চলে গেলে।ততক্ষণে দুলালদা এসে দেখে নূরুলদা অগ্নিশর্মা হয়ে আছেন। ওনার রুদ্রমূর্তি দেখে দুলালদা ভয়ে কিছুই বলল না। ভাবল, পরে রাগ নেমে গেলে বুঝিয়ে বলবে। তারপরের দিন পার্টি জেলা কমিটির সভা শহীদ ভবনে। সেদিনই বিকেলে আমি ফিরব। পার্টি অফিসে গিয়েছি সবার সাথে দেখা করতে। নূরুলদা আমাকে দেখেই মিটিং কিছুক্ষনের জন্যে স্থগিত রেখে বেরিয়ে এলেন। সপ্তমে গলা চড়িয়ে বললেন, তুমি আমার কথা রাখো নি। তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তোমাকে আমি ¯স্নেহ করি। তোমার কাকা মেসো আমার বন্ধু। তোমার সিক্সটি-টু তে জন্ম। তুমি আমার বিশ্বাসভঙ্গ করলে। আমি তো হতবাক। এত রেগে গেছেন নূরুলদা। ঝড়ের বেগে কথাগুলি বলে আবার সভায় চলে গেলেন। সামনে বসেছিলেন ছবিদি। আমাকে নূরুলদার গালি দেওয়া শুনে বেরিয়ে এসেছিলেন গোপেনদা। নূরুলদা বেরিয়ে যেতে ফিক করে হেসে বললেন, মোগলাই খেপছে রে। কিতা করছস। যা বর্ধমান যা। মাতিস না। আবার খেপবো। তখন আমার মাথা গরম হয়ে গেল। দুলালদার ওপর সব রাগ ঝেড়ে দিয়ে আমি ছবিদি ও গোপেনদার কাছে নালিশ করতে শুরু করলাম। ছবিদি আমার প্রতি খুব সহানুভূতিশীল হয়ে পড়লেন। সত্যি, ও শুভর কথাটা একবার শুনলও না। না শুনেই গালি দিয়ে গেল। গোপেনদা হেসেই যাচ্ছেন। তখন দুলালদা বেরিয়ে এল, বলল, সরি সরি। আসলে নূরুলদা ওই সভার আগের দুটো গানকে যে এতটা গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছিলেন বুঝতে পারি নি। আমি ভযে কিছু বলতে পারি নি। পরে ওনাকে বলে দেবো।


আমি ফিরে গেলাম বর্ধমানে। ভুলেও গেলাম, কারণ ওনার কাছে বকুনি খাওয়াটা কোনো ব্যাপারই ছিল না আমাদের জন্যে। মাস দুয়েক পর দেখি নূরুলদার একটি পোস্টকার্ড এসেছে আমার হোস্টেলের ঠিকানায়। লিখলেন, ¯স্নেহের শুভ, কলকাতায় আসছি অমুক তারিখে। যোধপুর পার্কে থাকবো। একবার পারলে দেখা কোরো। আমার মাথা থেকে ততদিনে নূরুলদার বকুনির ব্যাপারটা চলে গেছে। আমি নির্দিষ্ট দিনে এলাম কলকাতায়। নূরুলদা অনেক গল্পগুজব করলেন। বর্ধমানের খোঁজ নিলেন। পার্টির কথা জিজ্ঞেস করলেন। অনেকক্ষণ আড্ডা দেওয়ার পর বেরিয়ে এলাম বাড়ি যাবো বলে। লিফটের সামনে এসে হঠাৎ বললেন, তুই রাগ করিস নি তো তোকে বকে ছিলাম বলে। এই দুলাল টুলাল এত দায়িত্বহীন, আমাকে বলবে তো তুই পার্টিরই প্রোগ্রামে দুল্লভছড়া গিয়েছিস। বলে, ভয়ে বলি নি। ভয় পাওয়ার কী আছে, আমি মারব নাকি! আমি বললাম, না, না। আমি কিছু মনে করি নি।



বর্ধমান থেকে ফিরে এলাম শিলচরে। কলেজে পড়ানোর কাজের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পার্টি রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হলাম। এই সময় থেকে নূরুলদা সর্বভারতীয় পার্টি সংগঠনে আরো বেশি বেশি জড়িয়ে পড়লেন। গুয়াহাটিতে বেশি সময় দেন। মাঝে মাঝেই যান ইম্ফলে। কিন্তু বরাক উপত্যকায় নানা কারণে পার্টির সংগঠন ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। এদিকে বরাকের নির্বাচনী রাজনীতি আরো বেশি বেশি করে ধর্ম-জাতপাতের নিগড়ে বাঁধা পড়ে যেতে থাকে। আদর্শবাদের বিদায় নিয়ে তার জায়গা নেয় অর্থশক্তির প্রাধান্য এবং পারিতোষিক বিতরণের মাধ্যমে নির্বাচনী সমর্থন আদায়ের রাজনীতি। নির্বাচনের পর নির্বাচনে নূরুলদা এবং তাঁর আদর্শবাদ পরাস্ত হতে থাকল। ভোটের অঙ্কে শক্তি ক্ষীণ হতে থাকল পার্টির। যে নূরুলদা কখনো নিজের মনিপুরিত্ব বা মুসলমান পরিচয়কে রাজনীতিতে টেনে আনেন নি, তাঁর সাধনভূমি বরাক এই জাতপাত-ধর্ম বিবেচনার রাজনীতির ক্ষেত্র হয়ে গেল। যিনি নিজেকে মার্কসবাদের আদর্শে নিবেদিত শ্রমিক কৃষকের মুক্তির স্বপ্নে দায়বদ্ধ এক রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তুলে ধরেছেন, তাঁর কোনো স্থান বরাকের নির্বাচনী রাজনীতিতে রইল না। মাত্র চৌদ্দ মাসের লোকসভার কর্মকালে তিনি লোকসভাকে সাধারণ মানুষের দাবি দাওয়া নিয়ে মুখর রেখেছেন। একবার মাত্র বিধানসভায় নির্বাচিত হয়ে বিধানসভাকে সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া আদায়ের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেছেন কুশলতার সঙ্গে। এসব বরাকের নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বহীন হয়ে গেল। 

আজ কজন জানে জরুরি অবস্থার সময় সারা দেশের সিপিআই (এম)-এর সাংসদদের মধ্যে মিসা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল মাত্র দুজনকে। একজন প্রবাদপ্রতিম জ্যোতির্ময় বসুকে। দ্বিতীয়জন ছিলেন মাত্র চৌদ্দ মাস লোকসভায় কাজ করতে পারা তরুণ সদস্য নূরুল হুদা। চৌদ্দ মাসেই লোকসভায় নূরুল হুদা নিজের কন্ঠস্বরকে এতটাই বলিষ্ঠতায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চেয়েছিলেন জরুরি অবস্থার সময় এই দুজন সদস্য যেন সভায় না আসতে পারে। নূরুলদা বরাকের রাজনীতিতে গুরুত্ব হারাতে শুরু করলেন কারণ তিনি দুর্গাপুজা বা ঈদে চাঁদা দেন না, দেবার সামর্থ্যও নেই। কথায় কথায় পকেট থেকে লাখ টাকা বের করে চাঁদা দেন না। যেখানে নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে, একবার মৌলানার দরবারে গিয়ে কুর্নিশ জানানো বা গুরুদেবের জন্মতিথির প্রভাতী বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নিতে হবে। এটাই এখন এখানকার রাজনীতির রেওয়াজ। উচ্চশিক্ষিত, হেলায় উচ্চপদের চাকরি ত্যাগ করে আসা, কাঁধে ঝোলা, কপর্দকহীন নিবেদিত প্রাণ, ত্যাগী রাজনীতিক নূরুল হুদার স্থান এমন একটি পরিসরে হবেই বা কেন। নূরুল হুদার মত মানুষকে বরাক শুধু প্রত্যাখান করে নি, ভোটে হারানোর জন্যে তাঁর মত মানুষের নামে সীমাহীন কুৎসা বইয়ে দেওয়া হয়েছে। মুসলমান গ্রামে গিয়ে বলা হয়েছে নূরুল হুদার হিন্দু স্ত্রী বাড়িতে মূর্তি পূজা করেন। হিন্দু পাড়ায় দেওয়ালে লেখা হয়েছে, পাকিস্তান থাকিয়া খাইলাম খেদা/কই আছলায় বা নূরুল হুদা। এরা জানেই না, দেশভাগ-উত্তর কলকাতার যাদবপুরের উদ্বাস্তু কলোনীতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতেন নূরুলদা উদ্বাস্তুদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন সংগঠিত করার জন্যে।


রবীন্দ্রনাথের ‘গানভঙ্গ কবিতায় পড়েছিলাম নবীন যুবা গায়ক কাশীনাথের অসাঙ্গীতিক গলার আস্ফালনের দেখনদারিতে চাপা পড়ে যাচ্ছে প্রবীণ সঙ্গীতসাধক বরজলালের গান। সভার মানুষ সঙ্গীতের সেই রসগ্রাহিতায় না মজে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কাশীনাথের দেখনদারির গলাবাজিতে। সভা শেষে ধীর পদক্ষেপে বরজলাল বেরিয়ে যাচ্ছে নির্জন পথ ধরে একাকী বাড়ির পথে। এখানে তাঁর সাধনার কোনো মূল্য নেই।
যদিও সাংগঠনিক দায়িত্ব নিয়ে নূরুলদা সর্বভারতীয় কৃষক সভার কাজে দিল্লিতে চলে যান, তবুও বরাকের নির্বাচনী রাজনীতি থেকে তাঁকে প্রত্যাখান, তাঁর মত মেধাবী নিবেদিত প্রাণ সৎ ও সংগ্রামী নেতার নেতার নেতৃত্ব গ্রহণ করতে বরাকের সাধারণ মানুষের অপারগতা দেখে নূরুলদাকে আমার কেমন যেন ‘গানভঙ্গ কবিতার বরজলালের মতই মনে হয়। সাধারণ মানুষের জন্যে জীবনকে সঁপে দেওয়ার মধ্যেও যে আভিজাত্য থাকে, নূরুলদা ছিলেন তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
নূরুলদা যখন দিল্লিতে ছিলেন, তখন ভিপি হাউসে তাঁর বাড়িতে সন্ধ্যে বেলা গেলে দেখা যেতো তিনি আর শ্রমিক নেতা মহম্মদ আমিন পাশাপাশি বসে টিভি দেখছেন। আর তাঁদের মধ্য দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে একটি বাচ্চা মেয়ে। নূরুলদা ও ছবিদি বাচ্চাটিকে গুড়িয়া বলে ডাকতেন। নূরুলদা ও ছবিদির ভীষণ আদরের ছিল গুড়িয়া। নূরুলদা কখনো খাইয়ে দিতেন, কোলে নিয়ে গল্পগুজব করতেন। নূরুলদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বাচ্চাটির পরিচয়। বললেন, ওর বাবা সত্যেন্দ্র সিং পাশের ঘরে থাকে। বিজেপি-র নেতা। পরের বার গিয়ে দেখলাম গুড়িয়া ছবিদির সাথে শুয়ে আছে। ছবিদি বললেন, ওরা এখন গাজিয়াবাদে চলে গেছে। আমাদের কাছে সারাদিন থাকবে বলে আজ ওকে আনিয়েছি। আজ নূরুলদা মারা যাওয়ার পর ছবিদির সাথে দেখা করতে যোধপুর পার্কের তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখি, দেওয়ালে গুড়িয়ার ছবি টাঙানো। ছবি দিকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, আমাদের সাথে দেখা করতে এই মাসের ৩০ তারিখ গুড়িয়াকে নিয়ে ওর বাবা আর মার কলকাতায় আসার কথা ছিল। আসা হল না। অসুস্থতার খবর পেয়ে সত্যেন্দ্র সিং গতকাল এসেছে কলকাতায়। কাঁদতে কাঁদতে ছবি দি বললেন, সব রাজনীতি দিয়ে বিচার হয় না শুভ। নীচে নেমে এসে দেখলাম, অচিন্ত্যদার ছেলে অরিন্দমের সাথে গাড়ি থেকে নামছে কৃষক সভার তরুণ নেতা বিজু কৃষ্ণাণ এবং বিজেপি নেতা সত্যেন্দ্র সিং। পিস হাভেনে নূরুলদার মরদেহকে রেখে ফিরে এসেছেন তাঁরা। মনে পড়ে গেল, তাঁর নিজের শহরেই উনআশি সালে তারাপুরে হেঁটে যাওয়ার সময় এক প্রাক্তন ফুটবল খেলোয়াড় তাঁর পেছনে পেছনে কুৎসিৎ ভাষায় গালিগালাজ করে অনুসরণ করে গিয়েছিল।

 আজ এসব কিছুর বাইরে চলে গেলেন নূরুলদা। সেই ফুটবলারও আগেই গত হয়েছে। আজ তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা আরো দরিদ্র হলাম। আমাদের রাজনীতি আরো শ্রীহীন হলাম। জানি না এই সত্য কোনোদিন আমরা বুঝবো কিনা।

শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৫

‘প্রাণবন্ধু আসিলা ঘরে`

সিলেটে আরকুম শাহ-র মাজারে যখন প্রথম যাই উনিশ শ নিরানব্বুই সালে। তখনই প্রথম শুনি এই গান। মাজারে অতিথি এলে মাজারের শিল্পীরা ঢোল করতাল বাজিয়ে নেচে নেচে গান করেন, ‘আমার আনন্দের আর সীমা নাই গো, প্রাণবন্ধু আসিল ঘরে`। এই মুহূর্তে বরাক কতটা আনন্দমুখর আমি জানি না। কারণ আমি বসে আছি চৌদ্দশ কিলোমিটার দূরে। মনে পড়ছে শুধু সেই দিনগুলি কথা। বর্ধমানে পড়তাম। কলকাতা থেকে কামরূপ এক্সপ্রেস গুয়াহাটি স্টেশনে পৌঁছলেই ছুটতাম জানতে রাতের ট্রেন পাবো কিনা। তখন ইন্টারনেটের যুগ নয়। অনওয়ার্ড রিজার্ভেশন করার একটা নিয়ম ছিল, টেলিগ্রাম পাঠিয়ে পরের ট্রেনের বার্থ রিজার্ভ করা যেতো। আমরা নিষ্ঠার সাথে প্রতিবারই সেটা করতাম। প্রতিবারই গুয়াহাটি স্টেশনে নেমে জানতাম সেই ট্রেলিগ্রাম পৌঁছোয় নি। তখনই খোঁজ শুরু হত টিটি-র। কারণ কাউন্টার থেকে বার্থ বুক করার সময় ততক্ষনে পেরিয়ে যেতো। সারা রাত্রি ও সারা দিনের ট্রেন সফরের ধকলকে অগ্রাহ্য করে টিটিকে খোঁজা। 

‘দাদা, একটা বার্থ হলেও চলবে। আমরা ভাগাভাগি করে নেবো।` টিটি-র কোন্ উত্তরের অর্থ সবুজ সংকেত আর কোন্টি নয়, আমরা ততদিনে জেনে গিয়েছি। যদিও মুখে সবসময়ই বলত, কোনো সিট নেই। এই ‘নেই` কথার কোনটা সত্যি সত্যি ‘নেই` আর কোনটা দর হাঁকানো, আমরা জানতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কত টাকাই বা পকেটে থাকত। ঝুলোঝুলি চালিয়ে যেতাম। ক্কচিৎ দুটো বার্থ পেয়েছি আমি আর বিশ্বতোষদা। কখনো একই বার্থে দুজনে দুদিকে মাথা দিয়ে ওর মাথাকে আমি বালিশ করে, আর আমার মাথাকে ও বালিশ করে পাহাড় লাইনে বাড়ি ফিরেছি, তার ইয়ত্তা নেই। কখনো কপাল খারাপ হলে সারা রাত, দুটো সিটের নীচে মাটিতে খবরের কাগজ পেতে অথবা বাথরুমের সামনের খোলা জায়গায় বসে রাত কাটিয়েছি। 

তবু এই লাইন নিয়ে আমাদের অহংকারের শেষ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখনই কেউ জিজ্ঞেস করত, বাড়ি কোথায়। আমি আর বিশ্বতোষদা শিলচর বলেই বলতাম, চৌদ্দশ কিলোমিটার দূরে। সাঁইত্রিশটা টানেল পেরিয়ে যেতে হয়। ট্রেনের জানলা দিয়ে হাত বাড়ালেই পাহাড়ের ঘাস, গাছের ডাল ছোঁওয়া যায়। বন্ধুরা অবাক হয়ে যেতো। আমরাও অবাক হতাম যখন প্রতি শনিবার অর্ঘ্য সেনের কাছে গান শিখতে কলকাতা আসতাম, তখন ইলেকট্রিক ট্রেনের বিদ্যুৎ গতি দেখে। নিজেরা ফিসফিস করতাম, কবে আমাদের বরাকেও এমন ট্রেন চলবে। আমাদের অনেক বন্ধু আশি নব্বুই কিলোমিটার দূর থেকে যাতায়াত করে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসত। 

কলকাতা থেকে একশ পাঁচ কিলোমিটার দূরত্ব ট্রেনে বর্ধমানে এসে অনুষ্ঠান করে আবার রাতেই কলকাতায় ফিরে যেতেন সুচিত্রা মিত্র, অর্ঘ্য সেন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ইন্দ্রানী সেনরা। আমাদের কাছে তা ছিল অভাবনীয়। আমাদের শিলচর থেকে হাফলং যেতেই দিন কাবার। কপাল খারাপ হলে রাতও মাটি। ধর্মনগর করিমগঞ্জও ছিল ট্রেনে দূর অস্ত্। আমার ছাত্রজীবন শুরু হয়েছিল নিউ বঙ্গাগাঁও থেকে ব্রডগেজের ট্রেন ধরা দিয়ে। এমএসসি পড়া শেষ হতে হতেই ব্রডগেজ চলে এল গুয়াহাটি অবধি। খুব তাড়াতাড়ি ব্রডগেজের লাইন চলে গেল লামডিং, এমনকী ডিব্রুগড় অবধি। শিলচর অধরাই রয়ে গেলে। লামডিং গুয়াহাটি মিটারগেজ তুলে দেওয়ার পর আমাদের স্বপ্নের কু ঝিকঝিক মিটারগেজ ক্রমেই হতশ্রী হতে থাকল। তবু সব মেনে নিয়েছিলাম আমরা, অচিরেই ব্রডগেজ আসছে। ছ’জন প্রধানমন্ত্রী এলেন গেলেন, আমরা পড়ে রইলাম সেই অন্ধকারেই। 

ভোট এলো ভোট গেলো। লোকসভায় যিনিই ভোট চাইতে আসেন, তিনিই বলেন, আমাকে ভোট দিন। ব্রডগেজ এনে দেবো। বিধানসভায় যিনি ভোট চান, তিনিও বলেন, আমাকে ভোট দিন, আমি এনে দেবো ব্রডগেজ। কখনো শুনি ট্রান্সপোর্ট লবির চক্রান্ত। কখনো শুনি দিল্লি উদাসীন। কখনো শুনি দিসপুর কাঠি নাড়ছে। আশ্চর্য কথা। যারা ভোট চাইতে আসতেন ব্রডগেজের নামে তাদের প্রত্যেকেরই টিঁকি বাঁধা ছিল দিল্লি কিংবা দিসপুরে। এমন কী ট্রান্সপোর্ট লবির মধ্যেও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তাঁদের অনেকেই। অনেক নেতারই বাস চলত নাইটসুপার ডেসুপার হয়ে। এখানে রঙের কোনো তারতম্য নেই। বরাকের মানুষ জানতেন সবই। আমাদের বঞ্চনার অপমান ক্রমে অন্তর্মুখী হল। 

বর্ণবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট একজন অন্ত্যজ যেমন নিজের জন্মের প্রতি ধিক্কারে একান্তে বলে, ‘জন্ম নিয়েছি ধূলিতে/ দয়া করে দাও ভুলিতে/ নাই ধূলি মোর অন্তরে`। তেমনি দুর্ভাগা বরাকের আমরাও আমাদের সব দুর্গতির কথা বলতে গেলেই বলতাম, আমাদের জন্মটাই অভিশপ্ত। আমরা কেঁদেছি কবিতায় গল্পে ছবিতে সিনেমায় ব্যর্থ শ্লোগানে। আমাদের নিয়ে খেলেছে কেউ কেউ। আমরা বুঝেও বুঝি নি। যখন আমাদের ক্রোধ তীব্র হয়েছে। কেউ কেউ ভয় পেয়েছেন, এই বুঝি সমস্ত মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফেটে পড়বে প্রবল বিক্ষোভে। তখনই গোপনে কেউ কেউ ছড়িয়ে দিয়েছেন বিষের হাওয়া। হিন্দু মুসলমান, গরু শুয়োরে মত্ত হয়ে ভুলে গিয়েছি, আমাদের সব না-পাওয়াগুলোর কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই। এখন গোটা বরাক জুড়ে আনন্দের হাওয়া বইছে। আমরা বাকি পৃথিবীর সাথে যুক্ত হচ্ছি। আমরা আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে থাকব না। জানি, এই মুহূর্তে এই দেশ ভাবছে এমন ট্রেনের কথা যা ছুটবে ঘন্টায় তিনশ কিলোমিটার বেগে। 

এখন স্মার্ট ট্রেন, স্মার্ট স্টেশন, স্মার্ট সিটির হাওয়া বইছে দেশজুড়ে। এই হাওয়ায় যে ট্রেন আমাদের আসছে, তার গতি হবে কোথাও ঘন্টায় তিরিশ কিলোমিটার, কোথাও পঞ্চাশ কিলোমিটার। গোটা যাত্রাপথে সর্বোচ্চ গতিতে যাবে বরাকের ভেতরে শুধু। ঘন্টায় সত্তর কিলোমিটার। চারধারে আশঙ্কা। ক’দিন চলবে এই ট্রেন? বর্ষায় চালু থাকবে তো লাইন? নাকি আবার সেই দিনের পর দিন লাইন বন্ধ। জরুরি সামগ্রীর আকাল। কালোবাজারী। তবু আমাদের আজ আনন্দের সীমা নেই। জানি, উনবিংশ শতকে যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছিল অনেক পশ্চাৎপদ, যখন এখানকার পাহাড় জঙ্গল ছিল দুর্গম, তখন সাঁইত্রিশটি টানেল ও একটি দীর্ঘ রেলপথ গড়ে উঠতে সময় লেগেছিল আট বছর। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিপ্লবের চোখ ধাঁধানো এই সুসময়ে আমাদের সুড়ঙ্গগুলি ও লাইনকে বড়ো করতে আর কিছুটা নতুন লাইন পাততে সময় রেগেছে দীর্ঘ উনিশ বছর।

তবু আমাদের খুশির সীমা নেই আজ! আবার ট্রেন ছুটবে গুয়াহাটি থেকে শিলচর। হোক না ন্যূনতম চৌদ্দ ঘন্টার সফর। তবু হারেঙ্গাজাওয়ের সিঙারা। বদরপুরের পুরি তরকারি। মাহুরের প্যারা। জাটিঙ্গার কমলা। সব ফিরে আসছে আমাদের কাছে। হাফলং এ টিলার ওপরের হোটেলের ডিম ভাত নিউ হাফলঙে থাকবে কি? খুব বেশি চাওয়া নেই আমাদের। বুলেট ট্রেন চাই না। উলেকট্রিক ট্রেনের দরকার নেই। একটু ভালোবেসে, আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক না ভেবে একটি নিরবচ্ছিন্ন ট্রেন পরিষেবা হলেই হোলো। শিলচরে চাপবো নামবো কলকাতা বা চেন্নাই বা নতুন দিল্লিতে মোটামুটি স্বাভাবিক সময়ে, তাতেই হবে। আমি জানি না, এই মুহূর্তে যারা কৃতিত্বের প্রতিযোগিতায় মত্ত, তারা এই প্রতিশ্রুতিটুকু দিতে পারবেন কি না। মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছি আগামী ভোটের বড় বড় হোর্ডিং, দলের প্রতীক আলাদা হলেও কৃতিত্বের ব্রডগেজ ট্রেনের ছবি অভ্রান্তভাবেই ঠাঁই পাবে সেখানে। এই প্রবল প্রতিযোগিতার মধ্যে প্রতিযোগীরা নিশ্চয়ই ভুলে যাবেন, কিন্তু আমরা বরাকের মানুষরা যেন না ভুলি, আমাদের প্রতিবেশী রাজ্যের নাম যদি ত্রিপুরা না হতো, সেখানকার মানুষ যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হতেন, তবে উনিশ বছরেও এই লাইন জুড়তো কিনা আমার সন্দেহ আছে।

এটুকুমাত্র রাজনৈতিক উচ্চারণের জন্যে ক্ষমা চাইছি।

শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

ওই বুঝি কেউ হাসে!

বেশ কয়েক বছর আগেকার কথা। হায়দরাবাদে একটি সংস্কৃতি কর্মীদের সম্মেলনে গিয়েছি। সকালবেলা ঘুম ভেঙে গেল সমবেত কন্ঠের অট্টহাসিতে। খেয়াল করতেই বুঝলাম। এ তো যে যার মত কোনো একটি হাসির কথা শুনে হেসে ওঠা নয়। জানালা দিয়ে দেখি, সমবেত একদল লোক গায়ে টি শার্ট পায়ে কেডস পরনে ট্র্যাকসুট গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট ছন্দে সামনের দিকে মাথা ঝুঁকছে নিঃশব্দে, খানিকক্ষণ অবনতমস্তক থেকে তারপর ধীরে ধীরে ফুলের পাপড়ির ফোটার মত সোজা হচ্ছে এবং সঙ্গে সমবেত কন্ঠে গণসঙ্গীত গাওয়ার মত একটু একটু করে সশব্দে হাসিতে ফেটে পড়ছে। বুঝলাম, এটা প্রাণখোলা হাসি নয়। এটা কঠোর নিয়মানুবর্তিতার হাসি! মন নয়, শরীর চাঙ্গা করার হাসি! পাটনার নাট্যকর্মী বন্ধু হাসান ইমাম একটি উদ্ভট আইডিয়া দিলো। বলল, চলো, আমরা ওখানে যাই। একটু অদূরে দাঁড়িয়ে ওরা যখন চুপ করে সামনের দিকে মাথা ঝোঁকাবে তখন আমরা যে যার মত অট্ট হাসিতে ফেটে পড়বো। সেটা শুনে ওরা নিশ্চয়ই ভীষণ খেপে যাবে। বলবে, অ্যাই হতচ্ছাড়া, হাসছো কেন? আমরা উত্তরে গোবেচারা মুখ করে বলব, স্যার, আপনারাও তো হাসছেনই। শুধু আপনারা যখন চুপ করছেন তখন আমরা হাসছি। এ ছাড়া অন্য কিছু তো করি নি। উৎসাহী লোকের অভাবে শেষ পর্যন্ত এই হাসি অভিযান বা হাসি দিয়ে হাসি নিবারণ কর্মসূচিটা করা গেল না।

আমাদের রাষ্ট্র বা ধর্মের ব্যাপারটাও তেমনি। সবাইকে যখন হাসতে বলা হবে হাসতে হবে তখনই। অন্যথায় মুশকিল। একটা আইন কিংবা নিষেধের বেড়াজাল দিয়ে সবকিছুকে বাঁধতে চায় সবকিছুকে। একটি রাষ্ট্রে নিয়মকানুন যত সুক্ষ্ম নিষেধের বেড়াজালও তত সর্বগ্রাসী। এই নিয়মতান্ত্রিকতা ধর্মেও প্রবল। একটি ধর্ম যত বেশি সংগঠিত তার আচারের বেড়াজালও ততটাই তীব্র। যদিও ইতিহাসের একটা নির্দিষ্ট স্তরে এসেই রাষ্ট্রের পত্তন হয়েছে, ধর্মেরও তেমনি সংগঠিত রূপ এসেছে ইতিহাসেরই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে। তবু মানুষের সমাজের সাধারণ চলাটা সবসময়ই মুক্তির দিকে। তবে এই মুক্তি মানে তো আর যথেচ্ছাচার নয়। মানুষই নিজে থেকে কতগুলি বাড়াবাড়ি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে। সমাজ যেহেতু সকলের হাত ধরাধরি করে একসাথে চলার ফসল, ফলে সমাজ কখনোই চায় না, এমন কিছু হোক যার ফলে পরস্পর ধরে থাকা হাতটা আলগা হয়ে যায়। ব্যক্তির জীবনে বা পরিবারের আবহে বা সমাজের পরিসরে যদি এই ভালোবাসাবাসির সংস্কৃতিটি জেগে থাকে  তখন দেশে একটা সহনশীলতার আবহ জেগে থাকে। আইন করে সহনশীলতা জাগানো যায় না। খুব বেশি হলে কোথাও সহনশীলতার ব্যত্যয় ঘটলে তার প্রতিকার করা যায়। এখন মুশকিলটা হচ্ছে ধর্মই হোক বা রাষ্ট্রই হোক, সে নিয়মের শাসনকে প্রগাঢ় করতে গিয়ে ভুলে যায় নিয়মের প্রবর্তনটি ঠিক কী কারণে করা হয়েছিল। এটা অনেকটা ছোটোবেলায় শোনা শ্রীরামকৃষ্ণের কথা ও গল্পের ‘কৌপীনকা ওয়াস্তে‘ গল্পের মত। গৃহী মানুষ সংসার চেড়ে বনে গেলেন সন্ন্যাসী হওয়ার জন্যে। ইঁদুর কৌপীন কেটে কেটে কুটি কুটি করে দেয় বলে প্রথমে বিড়াল আনা, তারপর বিড়ালের জন্যে গরু, গরুর জন্যে রাখাল, রাখালের জন্যে তার সংসার, সংসারের জন্যে সমাজ, সবশেষে বনে এসেও সংসারীই হয়ে যেতে হল। 

আমাদের আচারসর্বস্ব ধার্মিক বা আইনসর্বস্ব রাষ্ট্ররক্ষকদের অবস্থাও তাই। মানুষের সমাজকে সুন্দরতর হবে ভেবে যে সমস্ত আচার বা আইনের প্রবর্তন হয়েছিল একদিন, এখন সেই আচার বা আইনের ঠেলাতেই সমাজের প্রায় দফরফা অবস্থা। মরমীয়া সাধকরা যেমন বলেন সেই কথাটাই সত্য হওয়া উচিত। তাঁরা বলেন, আচারের চেয়ে বিচার অনেক বড়ো বিষয়। প্রথমেই বিচার করে দেখা উচিত একটি বিশেষ আচার বা আইন মানুষের সমাজে ভালোবাসাবাসির সংস্কৃতি বা পারস্পরিক বিশ্বাসবোধের সংস্কৃতিকে পোক্ত করছে না দুর্বল করছে। যদি দেখা যায় যে একটি আইন বা আচার পালন করতে গিয়ে মানুষের সমাজটাতেই আগুন লেগে গেল, একজন আরেকজনের বুকে ছুরি মারতে উদ্যত হচ্ছে তখন সেই আচার বা আইন যত প্রাচীন বা যত যুক্তিনিষ্ঠই হোক, তাকে মাথায় করে রাখলে সভ্যতার মৃত্যু অনিবার্য।

এখন এমন একটা সময়, যখন ‘এখানে মন্দির ছিল না মসজিদ ছিল‘ থেকে শুরু করে সমাজের সামান্যতম মনান্তরের বিষয়কেও আইনের বারান্দায় গিয়ে সমাধান খুঁজতে হয়, যখন সকলের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া হাজার হাজার মানুষের হত্যালীলার রূপকার শুধুমাত্র আইনের চোখে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ার জন্যে পুরুষোত্তমের স্বীকৃতি পেয়ে যান, তখন অসহিষ্ণুতার কালোছায়া যে আমাদের ঘর গেরস্থালির ভেতরমহল অবধি ব্যাপ্ত হবে এ আর আশ্চর্যের কী! আমাদের প্রতিটি রাষ্ট্র যেমন গড়ে উঠেছে প্রাথমিকভাবে মানুষের সমাজের চারা পানিতে, তেমনি প্রতিটি সংগঠিত ধর্মেরও জন্ম একটি লোকায়ত গৌণ মরমিয়া ধর্মের গভীর থেকে। প্রতিটি রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিল সেসময়ে চলতে থাকা রাষ্ট্রনৈতিক অবক্ষয়ের সামাজিক প্রতিবাদের গর্ভ থেকে। এভাবে প্রতিটি সংগঠিত ধর্মেরও প্রাথমিক অঙ্কুরোদ্গম প্রচলিত ধর্মব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগঠিত সামাজিক বিদ্রোহের মধ্য দিয়েই। পরে প্রতিটি রাষ্ট্রই হয়ে উঠেছিল যারে পরাভূত করেছিল তাদেরই প্রতিভূ। একইভাবে সামূহিক সামাজিক বিচারবোধ থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিটি সংগঠিত ধর্মই পরে হয়ে ওঠে আচারের কারাগার। রাষ্ট্রের মত এখানেও স্পষ্ট হয় শ্রেণি আধিপত্যের কালো ছায়া।


এমনিতে একটি সমাজ এমনটা কখনো হয় না যেখানে কিছু ব্যাপারে কট্টরপন্থা থাকলেও বাকি বিষয়গুলিতে সাধারণভাবে এক উদার ও সহিষ্ণুতার আবহ থাকবে। ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে তৈরি হওয়া অসহিষ্ণুতা শেষ পর্যন্ত এক চূড়ান্ত অ-গণতন্ত্রের সমাজ তৈরি করে। তখন শুধু কে সংখ্যায় কম তাকেই যাবতীয় অসহিষ্ণুতার বিষ গ্রহণ করতে হয় না। মুক্তচিন্তক থেকে শুরু করে নাট্যকর্মী, গায়ক থেকে চলচ্চিত্রশিল্পী, লেখক থেকে বিজ্ঞানী সকলেই হয়ে ওঠেন অসহিষ্ণু হিংস্রতার শিকার। সাধারণতন্ত্র বা গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে রাজত্ব বিস্তার করে তখন এক ধরনের ইতরতন্ত্র বা দঙ্গলতন্ত্র (mobocracy)। আর এই সার্বিক মাৎস্যন্যায়ের থেকে মানুষকে মুক্তির অপার দরিয়ায় নিয়ে যাবে এমন কোনো ধর্ম বা রাষ্ট্র তখন চোখে পড়ে না। তো, কথা হল মুক্তি কোথায়! হয়ত এক বিকল্প গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা ‘ধর্ম‘কে গড়ে তুলতে হবে এই প্রচলিত রাষ্ট্র বা ধর্মকে অন্তর্ঘাত করেই। সেই কাজটি করতে পারে কোনো বীর নয়, সামাজিক মানুষ। এক অপার ভালোবাসা এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারাই পারে এমন অসাধ্য সাধন করতে। আমাদের জীবদ্দশায় তা যদি না-ও হয় ক্ষতি কি? রবীন্দ্রনাথ তো বলেইছেন, তোমার কাছে পৌঁছনোটাই বড়ো কথা নয়। ‘পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া‘। এভাবেই মানুষের সভ্যতা যুগে যুগে হাজারো মন্দের মধ্যে এক সামূহিক ভালোর স্বপ্নে বাঁচে। আমাদের শিল্পকলা সেই অধরা মাধুরীকেই ধরে ছন্দের বন্ধনে। বিধিনিষেধের আচারসর্বস্বতা বা আইনসর্বস্বতার কালো ছায়া আমাদের মনের গভীর থেকে যত সরবে ততই সূর্যের আলো পেয়ে জীবন পাবে মানুষের সমাজ এবং তার নন্দন।

সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৫

আমার গণসঙ্গীত শিক্ষক

ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ শিলচর শাখার সভাপতি চিন্টু সেনের মরদেহ তখন শিলচরের শ্মশানের চুল্লিতে দাহ হচ্ছে। আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি এদিকে ওদিকে। মুকুন্দকাকু ও গৌরাঙ্গদা দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একটি সিগারেট ভাগ করে খাচ্ছেন। আবাল্য বন্ধু দুজন এভাবেই সিগারেট খেতেন। চিন্টুদা‘র চিতা জ্বলছে। পাশের চুল্লিটা খালি। মুকুন্দকাকু আধ খাওয়া সিগারেটটা গৌরাঙ্গদাকে দিয়ে বললেন, গৌরাঙ্গ, ওই দ্যাখ, চিন্টুদার পাশের চুল্লিটা ফাঁকা। চল, দুজনে এখান থেকে রেস লাগাই। কে আগে ওখানে উঠতে পারে। গৌরাঙ্গদা সিগারেটে টান দিতে দিতে বললেন, তুই যা, আমি সিগারেটটা শেষ করে আসছি। ওদের দুই বন্ধুর কথোপকথন শুনে তখন আমরা হেসেছিলাম। সেদিনের কথাই সত্য হল। ২০০৭ সালের ৬ আগস্ট গৌরাঙ্গদা‘কে পেছনে ফেলে মুকুন্দকাকু চলে গেলেন। আজ ৮ বছর পর আগস্ট মাসেই গৌরাঙ্গদাও চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। সত্যি যদি ওরকম একটা দেশ থাকত। তবে এতক্ষণে মুকুন্দকাকু তাঁর হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা গৌরাঙ্গদার হাতে তুলে দিয়ে বলছেন, অত দেরি করলে কেনে ব্যাটা!


সত্যি ভীষণ শূন্য লাগছে। ২০০৭ সালে শিলচর ছেড়ে যাবার পর থেকে যখনই যত কম সময়ের জন্যেই শিলচরে এসেছি, তখণই একটি কর্মসূচি আমার বাঁধা ছিল। কিষাণকে ডেকে বলতাম, চল সবার সাথে একবার দেখা করে আসি। কিষাণও জানত আমার কর্মসূচি। স্কুটারে আমাকে পেছনে বসিয়ে তার স্কুটার প্রথমে ছুটত বিটি বলেজের উল্টোদিকে ‘স্মরণ‘ বাড়িটায়। দরজা খুলে ভেতরে স্বাগত জানাতেন অনন্তকাকু, অনন্ত দেব। খানিকক্ষণের মধ্যেই তাঁর সাথে শুরু হতো আমার নানা বিষয়ে তর্কবিতর্ক। সত্য কথা বলতে কি, আমার আর অনন্তকাকুর, একজনের শ্রদ্ধা আর আরেকজনের স্নেহের প্রকাশটাই ছিল উচ্চস্বরে তর্কাতর্কিটা। সেটা সেরেই দ্বিতীয় গন্তব্য, হসপিটাল রোড থেকে বাঁয়ে অম্বিকাপট্টির দিকে মোড় নিয়ে লোহার গেট। কলিং বেল টিপে ভেতরে ঢুকে অনুরূপাদির সাথে দেখা করা।  বামরাজনীতি, বরাকের ভাষা চেতনা, ইতিহাস থেকে শুরু করে অতীতের স্মৃতিচারণ কত কত কথা। এরপরের গন্তব্য কিষাণ জানে সেন্ট্রাল রোড। বিশাল বাড়ির এ ঘরে ও ঘরে ঢুকে আনুপিসির খোঁজ, কোণের ঘরে গিয়ে মঙ্গলাপিসির পাশে খানিকক্ষণ বসা। একটু কথা বলা। চা খাওয়া।


তারপরই স্কুটারের শেষ গন্তব্য আর্যপট্টি। গৌরাঙ্গদার বাড়ি। যতদিন সুস্থ ছিলেন। গৌরাঙ্গদার ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হল গানের কথা। পুরোনো কোনো গান পাচ্ছেন না। সুর মনে আছে, কথা মনে নেই। আমাকে বলতেন কলকাতা গণনাট্য অফিসে গিয়ে যেন ওই গানের বাণীর খোঁজ করি। একটু একটু করে এই গন্তব্যের সংখ্যা শেষ হয়ে আসছে। দলছুট-এর ডাকে শেষ শিলচর গিয়ে গৌরাঙ্গদার কাছে গিয়েছি। খুবই অসুস্থ। থুতনিতে একটু একটু দাড়ি, গালেও হালকা দাড়ির ছোঁয়া। দেখতে অবিকল ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ যেন। কানে একটু কম শুনছেন। বললেন, প্রসাদের অনুষ্ঠানটা খুব ভালো হচ্ছে। তারপরই জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ছেলে মেয়েরা আসে নি? বললাম, এসেছে। ‘ওদের নিয়ে এসো‘। এই কথাটাই এখন খুব বেশি কানে বাজছে, কারণ ওদের নিয়ে আর যাওয়া হয় নি।


গত শতকের আটের দশকে আমি ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাম রাজনীতিতে আসি। সভাসমিতিতে গান গাইতে বলা হত। গণসঙ্গীত তো জানি না। তখন শিলচরে গণসঙ্গীতের চর্চাও কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। মে দিবসের সময় দেখতাম কয়েকজনকে নিয়ে এক প্রৌঢ় গণসঙ্গীত গাইছেন সভার আগে। তিনি পেছনের সারিতেই থাকতেন, গলা শোনা যেতো না। পরে আলাপ হল। তিনিই গৌরাঙ্গদা। এর কিছুদিন পর শিলচরে ‘দিশারী‘র প্রতিষ্ঠা হল। গৌরাঙ্গদা গণসঙ্গীত শিখিযে দিতেন। এভাবেই শুরু তাঁর কাছে গণসঙ্গীত শেখা। পরে ‘দিশারী‘ ছেড়ে দিলেন গৌরাঙ্গদা। তখন আমি গৌরাঙ্গদা দুপুরে চেম্বার থেকে বাড়িতে ভাত খেতে যখন যান সেই সময়টায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে নানা গণসঙ্গীত তুলতাম। ‘দিশারী‘তে তখন পুরোনো গণসঙ্গীত যত গাওয়া হত, তার নব্বুইভাগ গৌরাঙ্গদার কাছ থেকে তোলা। সলিল চৌধুরীর ‘ও মোদের দেশবাসীরে‘ থেকে শুরু করে নানা গান ‘হো সাবধান আয়া তুফান‘ ‘অব মচল উঠা হ্যায় দরিয়া‘ ‘ইসবার লড়াই লানেওয়ালে‘ কত কত গান। পরে আমরা ‘পূর্বাভাস‘ নামে একটি সংগঠন করার চেষ্টা করেছিলাম। দুয়েকটা অনুষ্ঠান আর কিছুদিন রিহার্সেলের পর সেই দলটিকে আর টিকিয়ে রাখা গেল না। সেখানেও গান শেখাতেন গৌরাঙ্গদা। ‘হারাবার কিছু ভয় নেই‘ ‘সে আমার রক্তে ধোয়া দিন‘। তখন গৌরাঙ্গদার বড়ো ছেলে গৌতমদা (বাবা ছেলে দুজনকেই দাদা বলে ডাকাটা আমাদের বামপন্থী মহলে একসময়ে খুবই চালু ছিল) উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। সেখানে পড়ার সময় সে যুক্ত ছিল গণনাট্যের উত্তরধ্বনি শাখার সাথে। গৌতমদা শিলচর এল যখন তখন সিটুর উদ্যোগে চা মজদুর সমিতির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। সেই প্রতিষ্ঠা সভায় গাওয়ার জন্যে গৌতমদা আমাদের শিখিয়েছিল ‘চা বাগিচার কলি ওই‘ এবং ‘সুনো ও কুম্পানি লোগ‘ গান দুটি।


আমি বর্ধমান থেকে পড়াশুনা শেষ করে শিলচর ফিরে দেখলাম গণনাট্য পুনর্গঠিত হয়েছে। ইতিমধ্যে মুকুন্দকাকু লখনউ থেকে অবসর নিয়ে ফিরে এসেছেন। গণনাট্যের পুরনো সময়ের মুকুন্দকাকু, গৌরাঙ্গদা, বিজুদা, ফণীদা, পল্টুদা, পলুদা, জিসুদা, মিলনদা, ওঁদের এবং আমাদের সকলের মাথার ওপর অভিভাবকস্বরূপ চিন্টুদাকে নিয়ে আমাদের গণনাট্যের কাজ শুরু হল পুরোদমে। আমাদের অনুজদের এক বড়ো দল এবং প্রবীণদের সঙ্গে পেয়ে গণনাট্যের কাজে বান ডাকল। নানা ধরনের অনুষ্ঠান। একের পর এক ব্যালে পরিবেশিত হল ‘অপারেশন ব্রহ্মপুত্র‘ ‘এক পয়সার ভেঁপু‘ ‘দুই বিঘা জমি‘ ‘ইরাবত সিংহ‘। কিছুদিন পর পরের প্রজন্মের গণনাট্য কর্মী জয়ের উদ্যোগে আমরা করলাম ‘আফ্রিকা‘ এবং আরো অন্যান্য ব্যালে। একের পর এক গান লিখছে প্রসাদ হৃষিকেশ। গণনাট্যের কর্মকাণ্ডের শেষ নেই। এই সমস্ত কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে রয়েছেন গৌরাঙ্গদা। কিন্তু কোথাও তাঁকে সোচ্চারে দেখা যেত না। তিনি বরাবরই অন্যকে ঠেলে দিয়ে নিজে পেছনের সারিতে।


সম্ভবত চুরানব্বুই পচানব্বুই সালে আমরা ‘গণনাট্য - একাল ও সেকাল‘ বলে একটি অনুষ্ঠান করার উদ্যোগ নিই। তখন জেলা গ্রন্থাগার বন্ধ। শহরে একমাত্র প্রেক্ষাগৃহ আরডিআই হল। মুকুন্দকাকু একালের শিল্পীদের নিয়ে তৈরি করলেন কিছু অবিস্মরণীয় নৃত্য প্রযোজনা। আবার তিনিই মহা উৎসাহে নেমে পড়লেন তাঁদের যুগের বন্ধুদের দিয়ে অনুষ্ঠান করার। ঢাকাই পট্টিতে পল্টুদার বাড়িতে মহড়া বসল। আমাকে যেতেই হবে। হারমোনিয়াম ধরার জন্যে। ঘরে প্রবীণদের ভিড়। মুকুন্দকাকু, গৌরাঙ্গদা, বিজুদা, পল্টুদা, জিসুদা, মিলনদা, নীলুদা, পলুদা, ফণীদা। পল্টুদার কাঠের দোতলায় আসর সরগরম। বন্ধুরা ভুলেই যাচ্ছেন, পাশে তাঁদের সন্তানসম একজন বসে আছেন। হাসি ঠ্ট্টা রসিকতায় যেন ফিরে গেছেন তাঁদের যৌবনে। দেখা গেল মুকুন্দকাকুর সব গানের বাণী মুখস্থ। গৌরাঙ্গদার সুর স্মৃতিতে জীবন্ত। ‘রাজমিস্ত্রির গান‘ তাঁদের পুরনো প্রযোজনা। ফণীদা নাচবেন। সঙ্গে গান গাইবেন পল্টুদা ও গৌরাঙ্গদা। আমি হারমোনিয়ামে, তবলায় প্রসাদ। রিহার্সেলে পল্টুদা গৌরাঙ্গদা দুজনে গলা মিলিয়ে গান গাইলেও স্টেজে উঠে গৌরাঙ্গদা শুধু মাথা নেড়েই গেলেন। সামনে মাইক রয়ে গেল অব্যবহৃত। পল্টুদা একাই গেয়ে গেলেন। অনুষ্ঠানের পর আমি গৌরাঙ্গদাকে বললাম, এ কী করলেন। আপনি গলা ছাড়লেনই না কেন? এত সুন্দর করে দুজনকে দুটো মাইক দিলাম। উনি আমাকে উল্টে বুঝিয়ে দিলেন, আরে পল্টুকে দিয়ে গানটা গাইয়ে নিলাম। এটাই তো অ্যাচিভমেন্ট। আমি হতবাক!


গৌরাঙ্গদাকে নিয়ে অসংখ্য স্মৃতি। মুকুন্দকাকু ও গৌরাঙ্গদা আবাল্য বন্ধু। এক পাড়ার ছেলে। একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়েছেন। এতটাই বন্ধু যে বুড়ো বয়সেও যৌবনের অভ্যেসে একই সিগারেট দুজনে ভাগাভাগি করে খেতেন। মুকুন্দকাকুর যত গুরুতর অসুখই হোক, তিনি গৌরাঙ্গদা ছাড়া আর কোনো ডাক্তারের ওষুধ খাবেন না। শেষ বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বোধহয় প্রথম মুকুন্দকাকু গৌরাঙ্গদা ছাড়া অন্য কারো ওষুধ খেয়েছেন। মুকুন্দকাকু কখনোই গৌরাঙ্গদাকে গিয়ে ওনার অসুস্থতার বিবরণ দিতেন না। গিয়ে বলতেন, গৌরাঙ্গ, দিলা। গৌরাঙ্গদাও অসুস্থতার বৃত্তান্ত না শুনেই ওষুধ দিতেন এবং মুকুন্দকাকুও সুস্থ হয়ে উঠতেন। আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কী করে বোঝেন ওনার কী হয়েছে। হেসে বললেন, ওর তো জ্বর আর পেট খারাপ ছাড়া কিছু হয় না। জ্বর হয়েছে কি না দেখলেই বোঝা যায়। যখন দেখি জ্বর না, তখন বুঝি যে পেট খারাপ হয়েছে। এই ওষুধ আনার একটি ঘটনা নিয়ে একবার মুকুন্দকাকু ও গৌরাঙ্গদার মধ্যে মনোমালিন্য হয়ে গেল কিছুদিনের জন্যে। কেউ কারো সাথে কথা বলেন না। আমরা পড়লাম মহা মুশকিলে। দুজনেই দুজনের নামে আমাদের কাছে নালিশ করেন। অত বয়োজ্যেষ্ঠদের বিচার তো আর আমরা করতে পারি না। অগত্যা আমরা সভাপতি চিন্টুদাকে গিয়ে বললাম সমস্যার কথা। সব শুনে চিন্টুদা বললেন, দেখছি। বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে হারামজাদাদের। একদিন বিকেল চারটের সময় গৌরাঙ্গদা ও মুকুন্দকাকু, দুজনেরই ডাক পড়ল চিন্টুদার বাড়িতে। কেউই জানেন না, ওই একই সময়ে যে অন্যজনকেও ডেকেছেন চিন্টুদা। আমি আর প্রসাদ ভয়ে ভয়ে সেন্ট্রাল রোডে অপেক্ষা করছি, কী হবে এই বিচারসভার। হঠাৎ দেখি একই রিক্সা করে নতুনপট্টির দিক থেকে ফিরছেন মুকুন্দকাকু ও গৌরাঙ্গদা। মুকুন্দকাকু তার আধ খাওয়া সিগারেটটা বাড়িয়ে দিচ্ছেন গৌরাঙ্গদার দিকে। আমাদের আনন্দের আর সীমা নেই। পরে চিন্টুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী করে ঝগড়া মেটালেন। চিন্টুদা বললেন, ঝগড়া মেটানো? আমার সামনে দুজনে দুজনকে দেখে অবাক! বুঝেছে আমি রাগ করেছি। বললাম, এই হারামজাদা। ন্যাংটো বয়স থেকে দুজন বন্ধু। এক বিড়ি দুজনে ভাগ করে খাস। তোদের ভীমরতি হয়েছে? যা, এক রিক্সায় করে বিড়ি ভাগাভাগি করে খেতে খেতে যা। বলে বিদায় করে দিলাম। দুজনে সুড়সুড় করে বেরিয়ে এলেন চিন্টুদার বাড়ি থেকে। বেরিয়ে একটা রিক্সায় চেপে একজন আরেকজনকে বললেন, সিগারেট আছে? ঝগড়া মিটে গেল।



এই কথাটা আজ মনে পড়ছে বারবার। তখন শহরটাও ছিল অন্য রকম। সমাজবন্ধন বলে একটা সংস্কৃতি ছিল সব কিছুর উর্ধে। চিন্টুদা শুধু সংগঠনের মাথা ছিলেন না। ছিলেন পাড়ার শহরের অভিভাবক। রাজনীতির মতপথ যাই হোক। একজন আরেকজনের সাথে সামাজিক আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা ছিল। চিন্টুদার মৃত্যুর পর একই ভাবে শূন্যতা অনুভব করেন নূরুল হুদা এবং সন্তোষ মোহন। এই কথাগুলি আমি এখন যেখানে বাস করি সেখানে গল্পকথার মত শোনাবে। জানি না. গৌরাঙ্গদাদের সময়ের সংস্কৃতি কতটা বেঁচে আছে শিলচরে এখনও। তবে অনেককিছুই নেই। গোপেনদা দিগেনদা রুক্মিণীদার কমিউনিস্ট পার্টিও নেই, চিন্টুদা, মুকুন্দকাকু, গৌরাঙ্গদাদের গণনাট্যও আর রইল না। আমরা উত্তরসূরীরা তাঁদের পতাকা যথাযথভাবে কাঁধে তুলে নিতে পারি নি, এটা স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা অন্তত আমার নেই। এবার উনিশে মে’র পর শিলচর থেকে ফিরে উল্টেপাল্টে দেখছিলাম ডানার কম্পিউটারে। হঠাৎ একটা ছবিতে চোখ আটকে গেল। গান্ধীবাগের শহীদ বেদির সামনে সেতু থেকে গৌরাঙ্গদাকে হাত ধরে নামতে সাহায্য করছে কমলেশ মিঠু। কেমন মনে হল, তিনি যেন তাঁর গন্তব্যে পৌঁছতে পারেন, সে জন্যে হাত বাড়িয়েছে মিঠু। একটু আগে ওয়াটস অ্যাপে গৌরাঙ্গদার শেষযাত্রার ভিডিও আপলোড করেছে রাজীব। দেখলাম, ফুল আর রক্তপতাকা আচ্ছাদিত গৌরাঙ্গদার মরদেহ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে শকট। পেছনে ভেসে আসছে মিঠুর কন্ঠস্বর, বাদলধারা হল সারা বাজে বিদায় সুর। গণনাট্য আন্দোলনের বিগত যুগের শেষ বাতিটাও নিবে গেল। মাথার ওপর এখন শুধু শূন্যতা। উত্তরযুগের আমরা নিজেদের প্রস্তুত করেছি কি?