বুধবার, ৯ মে, ২০১৮

কিছু তার বুঝি না বা!

বিকেলের পড়ন্ত রোদে একা হেঁটে পেরোই বীরহাটার সেতু। শীত চলে গেছে। গ্রীষ্ম আসি আসি করছে। ক’দিন ধরে মাঝেমাঝেই সন্ধ্যায় উঠছে মাতাল ঝড়, নামছে অঝোর বৃষ্টি। গতকাল সন্ধ্যার প্রবল বর্ষণের স্মৃতি যেন এখনও লেগে আছে আজকের মৃদুমন্দ হাওয়ায়। মন্দগতি বাঁকা নদীর জল তার স্বভাব আলস্য ছেড়ে ইদানীং একটু হলেও প্রাণ পেয়েছে। দিনের কাজের শেষের এই অলস হাঁটায় মনটা কেমন ‘গান-গান‘ করে।

এ কী?? এ গান কেন বাজছে ভেতরে??? ‘যে পথ দিয়ে যেতেছিলেম ভুলিয়ে দিল তারে/ আবার কোথা চলতে হবে গভীর অন্ধকারে‘! অন্ধকার কোথায়, চারধার তো আদুরে আলোয় ভরা। আমার গায়ে ঢলে পড়ছে যে সুবাতাস সে গাইছে, ‘জীবনলতা অবনতা তব চরণে/ হরষগীত উচ্ছসিত কিরণমগন গগনে‘। নেচে উঠছে ছন্দে ছন্দে মনিপুরি নাচের বোলে ‘এ কী লাবণ্যে পূর্ণপ্রাণ প্রাণেশ হে আনন্দবসন্তসমাগমে‘। তবে ওই গান কেন জাগে এই অসময়ে ভেতরে? বাইরের এই আনন্দবসন্তের বুকের গভীরে এ কোন্ রিক্ত হেমন্তের শূন্যতা? হঠাৎই কাঁচাপাকা দাড়িভরা মুখ, কাঁচাপাকা চুল, মাথায় বেতের টুপি ক্ষিতীশ চট্টোপাধ্যায়ের মুখটি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। স্বভাবদার্শনিক একদা আগুনখেকো নকশাল, অপ্রতিদ্বন্দ্বী মেধার ক্ষিতীশবাবু আমার গণিত বিভাগের শিক্ষক।

ক্যালেন্ডারের পাতা পেছনে চলে যায় চৌত্রিশ বছর আগেকার এক বসন্তে, গোলাপবাগে। বিভাগের প্রবীণ বিদায় অনুষ্ঠানে বসন্তকে সঙ্গী করেই গেয়েছিলাম ‘যদি তারে নাই চিনি গো, সে কি আমায় নেবে চিনে এই নবফাল্গুনের দিনে!‘ অগ্রজদের চলে যাওয়াকে গানে ভাষা দিতে এর পরেই গেয়েছি, ‘কেন আমায় পাগল করে যাস, ওরে চলে যাওয়ার দল‘। হারমোনিয়াম বন্ধ করে ফিরে যাচ্ছি, এমন সময় পাশে সার দিয়ে রাখা চেয়ারে বসা শিক্ষকদের মধ্য থেকে ক্ষিতীশবাবু ডাকলেন, ‘যেতে যেতে একলা পথে‘ জানো? ওটা গাও।’ ফিরে এসে আবার হারমোনিয়ামে আঙুল বোলাই। বাইরে সেন্ট্রাল লাইব্রেরির পুকুরের পাশের রাস্তার ধার বরাবর প্রাচীন গাছের সারিতে কচি সবুজের উজ্জ্বল উপস্থিতি। ওপারে প্রাণীবিদ্যা বিভাগের গায়ে লাল ফুলে ছেয়ে থাকা বীথি থেকে পুকুর পেরিয়ে ভেসে আসে আনন্দবাতাস। গোটা গোলাপবাগে তখন ‘কোন রঙের মাতন উঠল দুলে ফুলে ফুলে‘। যে গান গাইতে এসে এবার দাঁড়িয়েছি সে গান কোনো আত্মীয়তা পায় না আলো-হাওয়া-রৌদ্রে। খানিক বিস্ময় ও কিছুটা অনিচ্ছাতেই স্যারের অনুরোধের গান গাই।

কিছুদিন পর এক সন্ধ্যায় জিমন্যাসিয়াম হলে আন্তঃ বিভাগীয় নাটক প্রতিযোগিতার ফল প্রকাশের আগে বন্ধুদের অনুরোধে গাইতে উঠেছি। অপ্রস্তুত মঞ্চে উঠে কী গাইব ভেবে হারমোনিয়াম আঙুল বোলাতে ওই সন্ধ্যাই উঠে এল আমার বয়ানে। ‘আমি সন্ধ্যাদীপের শিখা, অন্ধকারের ললাটমাঝে পরানু রাজটীকা‘। বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুরা বারবার শুনতে চাইত ‘আমার নাইবা হল পারে যাওয়া‘। দর্শকাসন থেকে সোচ্চার অনুরোধ ভেসে এলো। গাইলাম। তারপর উইংসে একটি জুনিয়ার ছেলে ফিসফিস করে প্রায় বলে, ‘একজন স্যার ‘যেতে যেতে একলা পথে‘ শুনতে চাইছেন‘। এই উৎসবমুখর প্রাঙ্গনে এমন গান! আমি অবাক চোখে অন্ধকারে বসে থাকা দর্শকদের দিকে চোখ ফেলি। দেখি, অদূরে একটি কোণে একটি স্টিলের চেয়ারে বসে আছেন ক্ষিতীশবাবু। তারপরও বিভাগের নবীনবরণে, আমাদের বিদায় অনুষ্ঠানে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো অনুষ্ঠানে দর্শকাসনে ক্ষিতীশবাবু থাকলেই বলবেন, ‘শুভ, ওই গানটি গাও‘।

তখন এটাই শুধু ভাবতাম, স্যারের প্রিয় গান। খ্যাপা মানুষ, তাই প্রিয় গান সবসময় শুনতে চান। আমাদেরও তখন আগুনরাঙা যৌবন। পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশে উড়ছে সমাজতন্ত্রের পতাকা। সোভিয়েত চীন পূর্ব ইউরোপ ভিয়েতনাম কিউবা আফগানিস্তান পেরিয়ে বিপ্লবের বিজয়শকট ভারতে ঢুকল বলে। তিনটি রাজ্যে উড়ছে রক্তনিশান। বাকি রাজ্যে হতে আর কতক্ষণ। ক্ষিতীশবাবু সুপণ্ডিত সেজন্যে, আবার একদা-নকশাল সেজন্যেও কিছুটা দূরে থাকতাম। আমাদের চোখে ‘বাম হঠকারী‘। ভাবতাম উনিও হয়ত ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী‘ ভাবেন আমাকে। ফলে শ্রদ্ধা ছিল, দূরত্বও ছিল। আমাদের হৈ হৈ অনুষ্ঠানের মঞ্চে তখন ‘যেতে যেতে একলা পথে‘ চলত না। মন চাইত না। বন্ধুরাও চাইত না। তখন সময় ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো‘র। কিন্তু আশ্চর্য! বিদ্যুৎহীন অঝোর বৃষ্টির সন্ধ্যায় হোস্টেলের ঘরে হারমোনিয়াম নিয়ে হয়ত বসেছি। গাইছি ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’ বা ‘ওই যে মেঘের কোলে‘ বা ‘আমি তখন ছিলেন মগন গহন ঘুমের ঘোরে‘, তখন হঠাৎই কোনো টগবগে বামপন্থী বন্ধু গান থেমে গেলে অস্ফুটে বলত, ‘যেতে যেতে একলা পথে‘ গানটা কর্। ভাবতাম বাইরের প্রাকৃতিক অন্ধকার এ গান এনে দিয়েছে তাকে।

তারপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হল। পোল্যান্ডে বন্দর শ্রমিকরা ধর্মঘট করল সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে। শুক্রবার রাতের ওয়ার্ল্ড দিস ইউকের প্রণয় রায় আর ভেঙে পড়া লেনিনমূর্তি একাকার হয়ে গেল। শুক্রবার রাত এলেই বুকের ভেতর ছমছম করে, বুকের ভেতর কে যেন গায় ‘যে পথ দিয়ে যেতেছিলেম ভুলিয়ে দিল তারে‘। ট্যাঙ্কের ভেতর থেকে অপরাধীর মত টেনে হিঁচড়ে বার করা হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ফ্যাসীবিরোধী যুদ্ধের নায়ক চেচেস্কু আর তাঁর স্ত্রীকে। ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে উদ্যত বন্দুকের সারির দিকে তাকিয়েও তিনি অকুতোভয়। বাবরি মসজিদ ভাঙার রাত। শিলচরের শুনশান রাস্তার অন্ধকারে আমি আর প্রসাদ। আমাদের সজল চোখ। অন্ধকারে ঠোঁটের জ্বলন্ত আগুন- আমাদের শপথের, নাকি স্বপ্নের চিতার? অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে রাতের তারা খুঁজি। একটু আলো, একটু আলো চাই। ‘বুঝিবা ওই বজ্ররবে নূতন পথের বার্তা কবে‘!!!

রাশিয়া চীন পেরিয়ে এখন অন্ধকার ঘনিয়েছে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম থেকে কামদুনি পার্ক স্ট্রিট হয়ে নীল-সাদা রক্তগঙ্গা আর গৈরিক রামনবমীতে। এখনও বুকের কাছে বীণ বেজে উঠলেই অনিবার্যভাবে ‘যেতে যেতে একলা পথে’। বিপ্লবী ফকির রায়ের আত্মকথা প্রকাশের অনুষ্ঠানে ৩০ বছর পর দেখা ক্ষিতীশবাবুর সাথে। হারমোনিয়াম ধরতেই ‘শুভ, যেতে যেত একলা পথে‘। বললাম, ‘স্যার, ছাত্রজীবনেও এই গান আপনি অনুরোধ করতেন সব অনুষ্ঠানে‘। স্যার মৃদু, নাকি বিষণ্ন, হাসলেন। বললাম, বাংলাদেশের বাম সংস্কৃতি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন সেন ছিলেন একজন কৃষক নেতাও। সভা সমাবেশে তিনি কৃষকদের উদ্দীপিত করতে গাইতেন রবীন্দ্রনাথের নানা অন্য গান। কিন্তু একান্ত ঘরোয়া আসরে তাঁকে গাইতে বললেই অবধারিতভাবেই গাইতেন যেতে যেতে একলা পথে। জানি না এটা কী সংযোগ। ক্ষিতীশবাবুও এই গানের অনুরোধ করেন। আমিও এই গানই গেয়ে উঠি আজকাল থেকে থেকে।’

সম্প্রতি হয়ে গেল গণিত বিভাগের পুনর্মিলন। আনন্দ উচ্ছাসে ভরে আছে চারদিক। গাইতে উঠে ক্ষিতীশবাবুকে দেখে বললাম, ‘স্যার, সারাজীবন একটি গানই অনুরোধ করে গেছেন। আজ অন্য গান গাই?‘ স্যার অনুমতি দিতে গিয়েও একটু থমকে গেলেন, তারপর করুণ আর্তি, ‘ওটাই গাও। যেতে যেতে একলা পথে‘। গান শেষ করে বসি স্যারের পাশে। বললাম, ‘স্যার, এই গান আপনি সবসময় অনুরোধ করেন। আগে বুঝতাম না। এখন বুঝি। আমারও ভেতর জুড়ে এই গান এখন সবসময়। ঘুমে জাগরণে।‘

স্যার বললেন, ‘জানো তো আমি খুব সক্রিয়ভাবে নকশাল আন্দোলনে ছিলাম? বহুবার মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে বেঁচে ফিরে এসেছি। একবার ওই ঝড়ো সত্তরেই একটি গোপন আস্তানায় একটি ঝড়ো সভার মধ্যেই প্রবল ঝড় উঠল। সভা শেষ। ঝড়ও থেমে গেছে। সভায় ছিলেন চারুবাবু, সরোজ দত্ত, আমি এবং একজন বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মী। চারুবাবু বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মীকে বললেন, গান গাও ‘যেতে যেতে একলা পথে‘। সেই স্মৃতি আমার সর্বাঙ্গে জড়িয়ে আছে। গান বললেই আমার কাছে ‘যেতে যেতে একলা পথে‘। অনেক ভাঙন হয়েছে। অনেক বিভ্রান্তি। অনেক প্রশ্ন। অনেক সংশয়। তবু ‘ঝড় উঠেছে ওরে ওরে, ঝড় উঠেছে ওরে এবার, ঝড়কে পেলেম সাথী’ ভাবলেই রক্তের ভেতর এক অদ্ভুত প্রবাহ বয়ে যায়।‘
আজীবন ঝড়ই সাথী।

গানটি কি বুঝেছি? নাকি বুঝি নি? নাকি শুধু আভা? নাকি শুধু অনুমান? নাকি কিছুই বুঝি নি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন