সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৫

আমার গণসঙ্গীত শিক্ষক

ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ শিলচর শাখার সভাপতি চিন্টু সেনের মরদেহ তখন শিলচরের শ্মশানের চুল্লিতে দাহ হচ্ছে। আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি এদিকে ওদিকে। মুকুন্দকাকু ও গৌরাঙ্গদা দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একটি সিগারেট ভাগ করে খাচ্ছেন। আবাল্য বন্ধু দুজন এভাবেই সিগারেট খেতেন। চিন্টুদা‘র চিতা জ্বলছে। পাশের চুল্লিটা খালি। মুকুন্দকাকু আধ খাওয়া সিগারেটটা গৌরাঙ্গদাকে দিয়ে বললেন, গৌরাঙ্গ, ওই দ্যাখ, চিন্টুদার পাশের চুল্লিটা ফাঁকা। চল, দুজনে এখান থেকে রেস লাগাই। কে আগে ওখানে উঠতে পারে। গৌরাঙ্গদা সিগারেটে টান দিতে দিতে বললেন, তুই যা, আমি সিগারেটটা শেষ করে আসছি। ওদের দুই বন্ধুর কথোপকথন শুনে তখন আমরা হেসেছিলাম। সেদিনের কথাই সত্য হল। ২০০৭ সালের ৬ আগস্ট গৌরাঙ্গদা‘কে পেছনে ফেলে মুকুন্দকাকু চলে গেলেন। আজ ৮ বছর পর আগস্ট মাসেই গৌরাঙ্গদাও চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। সত্যি যদি ওরকম একটা দেশ থাকত। তবে এতক্ষণে মুকুন্দকাকু তাঁর হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা গৌরাঙ্গদার হাতে তুলে দিয়ে বলছেন, অত দেরি করলে কেনে ব্যাটা!


সত্যি ভীষণ শূন্য লাগছে। ২০০৭ সালে শিলচর ছেড়ে যাবার পর থেকে যখনই যত কম সময়ের জন্যেই শিলচরে এসেছি, তখণই একটি কর্মসূচি আমার বাঁধা ছিল। কিষাণকে ডেকে বলতাম, চল সবার সাথে একবার দেখা করে আসি। কিষাণও জানত আমার কর্মসূচি। স্কুটারে আমাকে পেছনে বসিয়ে তার স্কুটার প্রথমে ছুটত বিটি বলেজের উল্টোদিকে ‘স্মরণ‘ বাড়িটায়। দরজা খুলে ভেতরে স্বাগত জানাতেন অনন্তকাকু, অনন্ত দেব। খানিকক্ষণের মধ্যেই তাঁর সাথে শুরু হতো আমার নানা বিষয়ে তর্কবিতর্ক। সত্য কথা বলতে কি, আমার আর অনন্তকাকুর, একজনের শ্রদ্ধা আর আরেকজনের স্নেহের প্রকাশটাই ছিল উচ্চস্বরে তর্কাতর্কিটা। সেটা সেরেই দ্বিতীয় গন্তব্য, হসপিটাল রোড থেকে বাঁয়ে অম্বিকাপট্টির দিকে মোড় নিয়ে লোহার গেট। কলিং বেল টিপে ভেতরে ঢুকে অনুরূপাদির সাথে দেখা করা।  বামরাজনীতি, বরাকের ভাষা চেতনা, ইতিহাস থেকে শুরু করে অতীতের স্মৃতিচারণ কত কত কথা। এরপরের গন্তব্য কিষাণ জানে সেন্ট্রাল রোড। বিশাল বাড়ির এ ঘরে ও ঘরে ঢুকে আনুপিসির খোঁজ, কোণের ঘরে গিয়ে মঙ্গলাপিসির পাশে খানিকক্ষণ বসা। একটু কথা বলা। চা খাওয়া।


তারপরই স্কুটারের শেষ গন্তব্য আর্যপট্টি। গৌরাঙ্গদার বাড়ি। যতদিন সুস্থ ছিলেন। গৌরাঙ্গদার ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হল গানের কথা। পুরোনো কোনো গান পাচ্ছেন না। সুর মনে আছে, কথা মনে নেই। আমাকে বলতেন কলকাতা গণনাট্য অফিসে গিয়ে যেন ওই গানের বাণীর খোঁজ করি। একটু একটু করে এই গন্তব্যের সংখ্যা শেষ হয়ে আসছে। দলছুট-এর ডাকে শেষ শিলচর গিয়ে গৌরাঙ্গদার কাছে গিয়েছি। খুবই অসুস্থ। থুতনিতে একটু একটু দাড়ি, গালেও হালকা দাড়ির ছোঁয়া। দেখতে অবিকল ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ যেন। কানে একটু কম শুনছেন। বললেন, প্রসাদের অনুষ্ঠানটা খুব ভালো হচ্ছে। তারপরই জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ছেলে মেয়েরা আসে নি? বললাম, এসেছে। ‘ওদের নিয়ে এসো‘। এই কথাটাই এখন খুব বেশি কানে বাজছে, কারণ ওদের নিয়ে আর যাওয়া হয় নি।


গত শতকের আটের দশকে আমি ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাম রাজনীতিতে আসি। সভাসমিতিতে গান গাইতে বলা হত। গণসঙ্গীত তো জানি না। তখন শিলচরে গণসঙ্গীতের চর্চাও কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। মে দিবসের সময় দেখতাম কয়েকজনকে নিয়ে এক প্রৌঢ় গণসঙ্গীত গাইছেন সভার আগে। তিনি পেছনের সারিতেই থাকতেন, গলা শোনা যেতো না। পরে আলাপ হল। তিনিই গৌরাঙ্গদা। এর কিছুদিন পর শিলচরে ‘দিশারী‘র প্রতিষ্ঠা হল। গৌরাঙ্গদা গণসঙ্গীত শিখিযে দিতেন। এভাবেই শুরু তাঁর কাছে গণসঙ্গীত শেখা। পরে ‘দিশারী‘ ছেড়ে দিলেন গৌরাঙ্গদা। তখন আমি গৌরাঙ্গদা দুপুরে চেম্বার থেকে বাড়িতে ভাত খেতে যখন যান সেই সময়টায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে নানা গণসঙ্গীত তুলতাম। ‘দিশারী‘তে তখন পুরোনো গণসঙ্গীত যত গাওয়া হত, তার নব্বুইভাগ গৌরাঙ্গদার কাছ থেকে তোলা। সলিল চৌধুরীর ‘ও মোদের দেশবাসীরে‘ থেকে শুরু করে নানা গান ‘হো সাবধান আয়া তুফান‘ ‘অব মচল উঠা হ্যায় দরিয়া‘ ‘ইসবার লড়াই লানেওয়ালে‘ কত কত গান। পরে আমরা ‘পূর্বাভাস‘ নামে একটি সংগঠন করার চেষ্টা করেছিলাম। দুয়েকটা অনুষ্ঠান আর কিছুদিন রিহার্সেলের পর সেই দলটিকে আর টিকিয়ে রাখা গেল না। সেখানেও গান শেখাতেন গৌরাঙ্গদা। ‘হারাবার কিছু ভয় নেই‘ ‘সে আমার রক্তে ধোয়া দিন‘। তখন গৌরাঙ্গদার বড়ো ছেলে গৌতমদা (বাবা ছেলে দুজনকেই দাদা বলে ডাকাটা আমাদের বামপন্থী মহলে একসময়ে খুবই চালু ছিল) উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। সেখানে পড়ার সময় সে যুক্ত ছিল গণনাট্যের উত্তরধ্বনি শাখার সাথে। গৌতমদা শিলচর এল যখন তখন সিটুর উদ্যোগে চা মজদুর সমিতির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। সেই প্রতিষ্ঠা সভায় গাওয়ার জন্যে গৌতমদা আমাদের শিখিয়েছিল ‘চা বাগিচার কলি ওই‘ এবং ‘সুনো ও কুম্পানি লোগ‘ গান দুটি।


আমি বর্ধমান থেকে পড়াশুনা শেষ করে শিলচর ফিরে দেখলাম গণনাট্য পুনর্গঠিত হয়েছে। ইতিমধ্যে মুকুন্দকাকু লখনউ থেকে অবসর নিয়ে ফিরে এসেছেন। গণনাট্যের পুরনো সময়ের মুকুন্দকাকু, গৌরাঙ্গদা, বিজুদা, ফণীদা, পল্টুদা, পলুদা, জিসুদা, মিলনদা, ওঁদের এবং আমাদের সকলের মাথার ওপর অভিভাবকস্বরূপ চিন্টুদাকে নিয়ে আমাদের গণনাট্যের কাজ শুরু হল পুরোদমে। আমাদের অনুজদের এক বড়ো দল এবং প্রবীণদের সঙ্গে পেয়ে গণনাট্যের কাজে বান ডাকল। নানা ধরনের অনুষ্ঠান। একের পর এক ব্যালে পরিবেশিত হল ‘অপারেশন ব্রহ্মপুত্র‘ ‘এক পয়সার ভেঁপু‘ ‘দুই বিঘা জমি‘ ‘ইরাবত সিংহ‘। কিছুদিন পর পরের প্রজন্মের গণনাট্য কর্মী জয়ের উদ্যোগে আমরা করলাম ‘আফ্রিকা‘ এবং আরো অন্যান্য ব্যালে। একের পর এক গান লিখছে প্রসাদ হৃষিকেশ। গণনাট্যের কর্মকাণ্ডের শেষ নেই। এই সমস্ত কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে রয়েছেন গৌরাঙ্গদা। কিন্তু কোথাও তাঁকে সোচ্চারে দেখা যেত না। তিনি বরাবরই অন্যকে ঠেলে দিয়ে নিজে পেছনের সারিতে।


সম্ভবত চুরানব্বুই পচানব্বুই সালে আমরা ‘গণনাট্য - একাল ও সেকাল‘ বলে একটি অনুষ্ঠান করার উদ্যোগ নিই। তখন জেলা গ্রন্থাগার বন্ধ। শহরে একমাত্র প্রেক্ষাগৃহ আরডিআই হল। মুকুন্দকাকু একালের শিল্পীদের নিয়ে তৈরি করলেন কিছু অবিস্মরণীয় নৃত্য প্রযোজনা। আবার তিনিই মহা উৎসাহে নেমে পড়লেন তাঁদের যুগের বন্ধুদের দিয়ে অনুষ্ঠান করার। ঢাকাই পট্টিতে পল্টুদার বাড়িতে মহড়া বসল। আমাকে যেতেই হবে। হারমোনিয়াম ধরার জন্যে। ঘরে প্রবীণদের ভিড়। মুকুন্দকাকু, গৌরাঙ্গদা, বিজুদা, পল্টুদা, জিসুদা, মিলনদা, নীলুদা, পলুদা, ফণীদা। পল্টুদার কাঠের দোতলায় আসর সরগরম। বন্ধুরা ভুলেই যাচ্ছেন, পাশে তাঁদের সন্তানসম একজন বসে আছেন। হাসি ঠ্ট্টা রসিকতায় যেন ফিরে গেছেন তাঁদের যৌবনে। দেখা গেল মুকুন্দকাকুর সব গানের বাণী মুখস্থ। গৌরাঙ্গদার সুর স্মৃতিতে জীবন্ত। ‘রাজমিস্ত্রির গান‘ তাঁদের পুরনো প্রযোজনা। ফণীদা নাচবেন। সঙ্গে গান গাইবেন পল্টুদা ও গৌরাঙ্গদা। আমি হারমোনিয়ামে, তবলায় প্রসাদ। রিহার্সেলে পল্টুদা গৌরাঙ্গদা দুজনে গলা মিলিয়ে গান গাইলেও স্টেজে উঠে গৌরাঙ্গদা শুধু মাথা নেড়েই গেলেন। সামনে মাইক রয়ে গেল অব্যবহৃত। পল্টুদা একাই গেয়ে গেলেন। অনুষ্ঠানের পর আমি গৌরাঙ্গদাকে বললাম, এ কী করলেন। আপনি গলা ছাড়লেনই না কেন? এত সুন্দর করে দুজনকে দুটো মাইক দিলাম। উনি আমাকে উল্টে বুঝিয়ে দিলেন, আরে পল্টুকে দিয়ে গানটা গাইয়ে নিলাম। এটাই তো অ্যাচিভমেন্ট। আমি হতবাক!


গৌরাঙ্গদাকে নিয়ে অসংখ্য স্মৃতি। মুকুন্দকাকু ও গৌরাঙ্গদা আবাল্য বন্ধু। এক পাড়ার ছেলে। একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়েছেন। এতটাই বন্ধু যে বুড়ো বয়সেও যৌবনের অভ্যেসে একই সিগারেট দুজনে ভাগাভাগি করে খেতেন। মুকুন্দকাকুর যত গুরুতর অসুখই হোক, তিনি গৌরাঙ্গদা ছাড়া আর কোনো ডাক্তারের ওষুধ খাবেন না। শেষ বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বোধহয় প্রথম মুকুন্দকাকু গৌরাঙ্গদা ছাড়া অন্য কারো ওষুধ খেয়েছেন। মুকুন্দকাকু কখনোই গৌরাঙ্গদাকে গিয়ে ওনার অসুস্থতার বিবরণ দিতেন না। গিয়ে বলতেন, গৌরাঙ্গ, দিলা। গৌরাঙ্গদাও অসুস্থতার বৃত্তান্ত না শুনেই ওষুধ দিতেন এবং মুকুন্দকাকুও সুস্থ হয়ে উঠতেন। আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কী করে বোঝেন ওনার কী হয়েছে। হেসে বললেন, ওর তো জ্বর আর পেট খারাপ ছাড়া কিছু হয় না। জ্বর হয়েছে কি না দেখলেই বোঝা যায়। যখন দেখি জ্বর না, তখন বুঝি যে পেট খারাপ হয়েছে। এই ওষুধ আনার একটি ঘটনা নিয়ে একবার মুকুন্দকাকু ও গৌরাঙ্গদার মধ্যে মনোমালিন্য হয়ে গেল কিছুদিনের জন্যে। কেউ কারো সাথে কথা বলেন না। আমরা পড়লাম মহা মুশকিলে। দুজনেই দুজনের নামে আমাদের কাছে নালিশ করেন। অত বয়োজ্যেষ্ঠদের বিচার তো আর আমরা করতে পারি না। অগত্যা আমরা সভাপতি চিন্টুদাকে গিয়ে বললাম সমস্যার কথা। সব শুনে চিন্টুদা বললেন, দেখছি। বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে হারামজাদাদের। একদিন বিকেল চারটের সময় গৌরাঙ্গদা ও মুকুন্দকাকু, দুজনেরই ডাক পড়ল চিন্টুদার বাড়িতে। কেউই জানেন না, ওই একই সময়ে যে অন্যজনকেও ডেকেছেন চিন্টুদা। আমি আর প্রসাদ ভয়ে ভয়ে সেন্ট্রাল রোডে অপেক্ষা করছি, কী হবে এই বিচারসভার। হঠাৎ দেখি একই রিক্সা করে নতুনপট্টির দিক থেকে ফিরছেন মুকুন্দকাকু ও গৌরাঙ্গদা। মুকুন্দকাকু তার আধ খাওয়া সিগারেটটা বাড়িয়ে দিচ্ছেন গৌরাঙ্গদার দিকে। আমাদের আনন্দের আর সীমা নেই। পরে চিন্টুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী করে ঝগড়া মেটালেন। চিন্টুদা বললেন, ঝগড়া মেটানো? আমার সামনে দুজনে দুজনকে দেখে অবাক! বুঝেছে আমি রাগ করেছি। বললাম, এই হারামজাদা। ন্যাংটো বয়স থেকে দুজন বন্ধু। এক বিড়ি দুজনে ভাগ করে খাস। তোদের ভীমরতি হয়েছে? যা, এক রিক্সায় করে বিড়ি ভাগাভাগি করে খেতে খেতে যা। বলে বিদায় করে দিলাম। দুজনে সুড়সুড় করে বেরিয়ে এলেন চিন্টুদার বাড়ি থেকে। বেরিয়ে একটা রিক্সায় চেপে একজন আরেকজনকে বললেন, সিগারেট আছে? ঝগড়া মিটে গেল।



এই কথাটা আজ মনে পড়ছে বারবার। তখন শহরটাও ছিল অন্য রকম। সমাজবন্ধন বলে একটা সংস্কৃতি ছিল সব কিছুর উর্ধে। চিন্টুদা শুধু সংগঠনের মাথা ছিলেন না। ছিলেন পাড়ার শহরের অভিভাবক। রাজনীতির মতপথ যাই হোক। একজন আরেকজনের সাথে সামাজিক আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা ছিল। চিন্টুদার মৃত্যুর পর একই ভাবে শূন্যতা অনুভব করেন নূরুল হুদা এবং সন্তোষ মোহন। এই কথাগুলি আমি এখন যেখানে বাস করি সেখানে গল্পকথার মত শোনাবে। জানি না. গৌরাঙ্গদাদের সময়ের সংস্কৃতি কতটা বেঁচে আছে শিলচরে এখনও। তবে অনেককিছুই নেই। গোপেনদা দিগেনদা রুক্মিণীদার কমিউনিস্ট পার্টিও নেই, চিন্টুদা, মুকুন্দকাকু, গৌরাঙ্গদাদের গণনাট্যও আর রইল না। আমরা উত্তরসূরীরা তাঁদের পতাকা যথাযথভাবে কাঁধে তুলে নিতে পারি নি, এটা স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা অন্তত আমার নেই। এবার উনিশে মে’র পর শিলচর থেকে ফিরে উল্টেপাল্টে দেখছিলাম ডানার কম্পিউটারে। হঠাৎ একটা ছবিতে চোখ আটকে গেল। গান্ধীবাগের শহীদ বেদির সামনে সেতু থেকে গৌরাঙ্গদাকে হাত ধরে নামতে সাহায্য করছে কমলেশ মিঠু। কেমন মনে হল, তিনি যেন তাঁর গন্তব্যে পৌঁছতে পারেন, সে জন্যে হাত বাড়িয়েছে মিঠু। একটু আগে ওয়াটস অ্যাপে গৌরাঙ্গদার শেষযাত্রার ভিডিও আপলোড করেছে রাজীব। দেখলাম, ফুল আর রক্তপতাকা আচ্ছাদিত গৌরাঙ্গদার মরদেহ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে শকট। পেছনে ভেসে আসছে মিঠুর কন্ঠস্বর, বাদলধারা হল সারা বাজে বিদায় সুর। গণনাট্য আন্দোলনের বিগত যুগের শেষ বাতিটাও নিবে গেল। মাথার ওপর এখন শুধু শূন্যতা। উত্তরযুগের আমরা নিজেদের প্রস্তুত করেছি কি?

বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

দোহার- আমার স্বজন, সুজন

দোহারের কথা বললেই আমার চোখে ভেসে ওঠে এক স্বপ্নচারী মানুষের মুখ! প্রথম জীবনে সেই মানুষটি এতটাই সৌখিন ছিলেন যে তাঁর কেতাদুরস্ত জামা কাপড় তৈরি হয়ে আসত তখনকার বোম্বাই শহরের নামী দামি দোকান থেকে। পেশায় ফিল্ম ডিভিশনের ফোটোগ্রাফার এই মানুষটির লেন্সে চিত্রিত হতে বিশেষ পছন্দ করতেন নাকি স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধীও। মানুষটির অন্য পরিচয় তিনি ছিলেন লোকগানের ভিতরমহলের স্বজন। তবলা ছাড়াও নানা ধরনের যন্ত্রবাদনে তার ছিল অপরিসীম সহজাত দক্ষতা। পঞ্চাশের স্বর্ণযুগে গুয়াহাটিতে গণনাট্যের সম্মেলনে মহারাষ্ট্রের লোকশিল্পী ওমর শেখের সাথে সঙ্গত করতে গিয়ে যখন দিকপাল তালবাদ্যের শিল্পীরা কুপোকাত, তখন ক্যাম্পের খড়ের ওমে ঘুমিয়ে থাকা বালক বয়সের সেই মানুষটিকে তুলে নিয়ে ঢোল হাতে ওমর শেখের সামনে বসিয়ে দিয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। চোখ কচলে ঘুমের আচ্ছন্নতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া বালকটিকে দেখে বিদ্রুপ করেছিলেন ওমর শেখ। ‘হেমাঙ্গবাবু, এই বাচ্চা ক্যায়া বাজায়গা!‘ নিরুপায় হেমাঙ্গ বিশ্বাস উত্তরে বলেছিলেন, ‘অউর কোয়ি নেহি বাচা। অগর সাকেগা তো ইয়ে বাচ্চাই সাকেগা!‘

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জহুরির চোখ সেদিনও সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। হাল ফ্যাশনের আদবকায়দায় আদ্যোপান্ত সাবলীল মানুষটির জীবনে হঠাৎই একদিন বিপ্লব নিয়ে এল এক রিক্সাওয়ালা, নাম তুরফান আলি। রিক্সা চালানো তার পেশা হলেও সে ছিল এক লোকশিল্পী। বিলাসের বাহারি পোশাক ছেড়ে দিলেন তিনি। সাদা কুর্তা আর পাজামা গায়ে রিক্সাওয়ালা তুরফানকে সঙ্গী করে বরাকের মোকামে মোকামে আখড়ায় আখড়ায় মাটির গানের খোঁজে ঘুরে বেড়াতে থাকলেন। হয়ে উঠলেন বরাকের লোকসঙ্গীতের ভাণ্ডারী। তিনি অনন্তকুমার ভট্টাচার্য। হাজার হাজার গান সংগ্রহ করেছেন। কত কত লোকশিল্পীকে তুলে ধরেছেন সাধারণ্যে। তাঁদের ব্যক্তিজীবনের সুখদুঃখের সাথে এক হয়ে গেছেন। গড়ে তুলেছিলেন এমন একটি লোকগানের দল লোকবিচিত্রা, যা আকাশবাণীর বিচারে ভারতের প্রথম এ-গ্রেড পাওয়া লোকগানের দল। মানুষটাকে স্বপ্নচারী বলেছি প্রথমে। কারণ সময়ের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে ছিলেন অনন্ত কুমার। তাঁর স্বপ্নকে বুঝতে পারত না তাঁর সমকালের বেশিরভাগ মানুষ। এখন দৈনন্দিন জীবনের নানা ধরনের বাহ্যিক শব্দকে সঙ্গীতে ব্যবহার করার কথা বলছেন অনেকে এবং কিছু কিছু প্রয়োগ তারও শুরু হয়েছে।

তখন নব্বুইয়ের গোড়াতেই আকাশবাণীর মনোরেকর্ডিং-এর সীমাবদ্ধতাকে তুচ্ছ করে হাঁড়ি বাসন থালা কাঠের টুকরো সহ সঙ্গীতে সাধারণভাবে অনাবশ্যক নানা উপকরণকে বাদ্যযন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে এক অতুলনীয় সঙ্গীতসজ্জা তৈরি করেছিলেন অনন্তকুমার। স্বপ্ন দেখতেন আমাদের আধুনিক সঙ্গীত দক্ষিণের ইলিয়া রাজার মত লোকঐতিহ্যকে আত্মস্থ করে এগোবে। সময় থেকে এগিয়ে যাঁরা স্বপ্ন দেখেন তাঁদের অনেকেরই জীবন শেষ পর্যন্ত কাটে গভীর হতাশায় ও অপূর্ণতায় চরম দুঃখে। অনন্তকুমার স্বপ্নসম্ভাবনার অসংখ্য কুঁড়ি ফুটিয়েও অকালে চলে গিয়েছিলেন এই পৃথিবী থেকে। দোহার-এর প্রাণপুরুষ কালিকাপ্রসাদ অনন্তকুমারের ভাইপোই শুধু নয়, সে তাঁর সঙ্গীতাদর্শের উত্তরাধিকারীও। কাকার অপূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তব করার ব্রত থেকেই তৈরি করেছিল দোহার। অনেক পথ পেরিয়ে দোহার আজ শুধু সাবালক নয়, বাংলা গানের অন্যতম প্রধান নাইয়া। যে স্বপ্ন দেখতেন অনন্তকুমার ভট্টাচার্য তারই সার্থক রূপায়ণ আজ দোহারের মধ্যে। লোকসঙ্গীতের যে কোনো ধরনের বিকৃতির বিরুদ্ধে আমৃত্যু সোচ্চার ছিলেন অনন্তকুমার। যদিও লোকসঙ্গীতের আঞ্চলিকতাকে অস্বীকার না করে সৃজনশীল প্রয়োগের বিরোধী ছিলেন না তিনি। তরুণ কন্ঠের আধুনিক প্রয়োগকে ভালোই বাসতেন। জানতেন, গ্রামীণ লোকশিল্পীর গায়ন আর নাগরিক লোকসঙ্গীতশিল্পীর কখনো গায়ন এক হবে না। কিন্তু বাণিজ্যিক বিকৃতির ঔদ্ধত্য ও মূর্খতা কখনোই মেনে নিতে পারেন নি। কোনো প্রতিযোগিতা মঞ্চে হয়ত কেউ ইচ্ছেমত বিকৃত করছে কোনো পরম্পরাগত গানকে, বিচারাসন থেকে ‘হোল্ড!‘ বলে বজ্র গর্জনে থামিয়ে দিয়েছেন শিল্পীকে। রাগে ঠকঠক করে কাঁপতেন তখন। গভীর যন্ত্রণাবোধ থেকে জন্ম নেওয়া এই আপোষহীন মনোভাবকে ক‘জনই বা বুঝত! এখন যখনই দেখি সমকালে ঘটে যাওয়া লোকসঙ্গীতের নানা বিকৃতির বিরুদ্ধে দোহারের অনুষ্ঠানে গানের মাঝে সোচ্চার হয়ে উঠছে কালিকা, কানে যেন শুনতে পাই অনন্তকুমার ভট্টাচার্যের ‘হোল্ড!‘।


দোহারের কথা বলতে গিয়ে অনন্তকুমার ভট্টাচার্যের কথা এতটা সবিস্তারে বলার কারণ শুধু কালিকা বা অনন্তকুমারের সাথে আমার ব্যক্তি হিসেবে বিশেষ ভাবে সম্পর্কিত থাকা নয়। এটা বলা এই কথা বোঝাতেই যে, দোহার হঠাৎ একদিন আকাশ থেকে পড়ে নি। তারও একটা পূর্ব-ইতিহাস আছে, একটা ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করছে দোহার। শুধু দোহারই নয়, ব্যক্তি হিসেবে কালিকাও। একটা পরিবার, একটা প্রতিষ্ঠান, অসংখ্য মানুষ, একাধিক সংগঠন আন্দোলন, একটা বিরামহীন স্বপ্ন, সাধনার বহমানতায় জন্ম নিয়েছে দোহার। এখানেই তাঁরা কলকাতা শহরে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা বহু গানের দল থেকে আলাদা। আরেকটা কথা, শুধুমাত্র পূর্বসূরীর চর্চার যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি করে বা পূর্বসরীদের তৈরি করা ভাণ্ডারকেই সম্বলমাত্র করেও উত্তরাধিকার নির্মিত হয় না। উত্তরাধিকার নির্মিত হয় পূর্বসূরীদের চলা পথ বেয়ে নিজের সমসময়ে পথ হেঁটে। কালিকা শুধু তাঁর কাকার ভাণ্ডারকে ভেঙে গান গাইছে না। নিত্যনতুন লোকগানের খোঁজে নিজেও ঘুরে বেড়িয়েছে অসংখ্য গ্রাম শহর চাবাগিচা কয়লাখনিতে। শেকড় উৎখাত হয়ে পরবাসী হওয়া লোকসমাজের মানুষের লোকগানে কীভাবে ছায়া ফেলে নতুন সমাজকাঠামো এবং পরিবর্তিত জীবনপ্রবাহ, তারও সন্ধান করেছে সে একজন গবেষক হিসেবে। খালেদ চৌধুরী রণজিৎ সিংহ রণেন রায় চৌধুরী হেমাঙ্গ বিশ্বাসরা আমৃত্যু প্রান্তবাসী মানুষের গান নিয়ে সাধনা করেছেন এক অর্থে প্রান্তবাসী হয়েই। এটা নিয়ে আমাদের এক সশ্রদ্ধ মুগ্ধতা আছে ঠিকই। কিন্তু এর মাধ্যমে প্রান্তবাসী মানুষের গান নিয়ে মূলধারার সঙ্গীতচর্চায় সে অর্থে কোনো অন্তর্ঘাত ঘটানো যায় না। দোহার এক্ষেত্রে অনন্য। প্রান্তবাসী মানুষের গানকে সঙ্গী করে, কোনো বৈদ্যুতিন যন্ত্রের অনাকাঙ্খিত অনুপ্রবেশ ছাড়াই মূলধারার সংস্কৃতির আসরে নিজেদের জোরালো উপস্থিতি ব্যক্ত করেছে তাঁরা। প্রত্যাহ্বান জানিয়েছে সমাজের ওপরতলার সংস্কৃতির উদ্ধত মিনারকে। আজ মহানগরীর সঙ্গীতের আসরে নাগরিক স্রষ্টাদের পাশে একই সম্মানে গীত হচ্ছে শাহ আবদুল করিম, রাধারমন, দ্বিজদাস, মলয়া, দীন ভবানন্দ থেকে শুরু করে মুকুন্দ তেলির গান। বাণিজ্যিক সঙ্গীতের পরিমণ্ডলে এইসব মহাজনদের গান এবং লোকায়ত বাদ্যযন্ত্রকে একমাত্র নির্ভর করে যে মর্যাদার আসনে নিজেদের অধিষ্ঠিত করেছে দোহার, তা নিঃসন্দেহে শ্লাঘার বিষয়। সত্যি কথা বলতে কী বাংলা গানের সর্বাত্মক আকালের সময়েও আমরা যে এখনও স্বপ্ন দেখার সাহস পাই, তার অনেকটাই দোহারের জন্যে। সে জন্যেই দোহার আমার কাছে ভালোবাসার, শ্রদ্ধার এবং ভরসার একটি নাম।

পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া

বছরে একবার আমাদের মত অকিঞ্চিৎকর মানুষেরও একটা জন্মদিন আসে। জন্ম যেহেতু হয়েছে বছরে একবার জন্মদিন তো আসবেই। তেমনি এক জন্মদিনে বাংলাদেশের এক তরুণ শুভেচ্ছা পাঠালো ছোট্ট একটি লেখায়। বলল, জন্মদিনে শুভেচ্ছার পাশাপাশি দাবি এবার আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্যানপ্যানানি ছাড়ুন। এখন থেকে বলিষ্ঠ কন্ঠে গণসঙ্গীতই শুনতে চাই আপনার গলায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত অনেক হয়েছে। এমন দাবি প্রথম নয়। ছাত্রজীবন থেকেই শুনছি। আমার জীবনে ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃত্ততা এবং আকাশবাণীতে বড়োদের গ্রুপে গান গাওয়া একই সময় থেকে। যখন প্রথমদিন রেডিও থেকে আমার গান সম্প্রচারিত হওয়ার পর যখন পার্টি অফিসে এলাম, তখন আমার সাফল্যে সমবেত অহংকার প্রকাশের পাশাপাশি সমবয়সের কমরেড সহ অগ্রজরা বললেন, ভালো খুব ভালো, কিন্তু তোমার প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজেকে একজন গণসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলা। রবীন্দ্রসঙ্গীত টঙ্গীত এগুলো ঠিকই আছে, কিন্তু গান নিয়ে যদি বিপ্লবী রাজনীতির কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়, তবে গণসঙ্গীতই গাইতে হবে। তখন আমাদের অঞ্চলে গণসংস্কৃতি আন্দোলনের ভাঁটা চলছে। অতীতের গণসঙ্গীত গায়করা সমাজপটে দৃশ্যমান নন। কর্তব্যবোধের তাগিদেই গণসঙ্গীত শেখার জন্যে ভেতরে একটা অস্থিরতা। প্রথম শিক্ষক হল এক বন্ধু, যে শুনে শুনে কয়েকটি গণসঙ্গীত তুলেছে। মুশকিল হচ্ছে, তার গলায় সুর নেই। অগত্যা একটাই পথ বের করতে হল। ওকে দিয়ে পরিচিত কিছু গান গুণগুণ করিয়ে ঠাওর করার চেষ্টা করলাম, কোন সুরটা বিকৃত হয়ে ওর গলায় কী চেহারা নেয়। এভাবেই প্রকৃত সুরের একটা কাঠামো আন্দাজ করে ওর কাছ থেকেই আমার প্রথম দু’টি গণসঙ্গীত শেখা। হেই সামালো ও ভেদি অনশন মৃত্যু তুষার তুফান। পরে মূল গান শুনে দেখেছি কয়েকটি কোমল শুদ্ধ সুরের এদিক ওদিক ছাড়া বাকিটা ঠিকই আছে। সেই থেকে সভাসমিতিতে মূলত গণসঙ্গীত গাই আর রেডিও টেলিভিশন অনুষ্ঠান জলসায় প্রধানত গাই রবীন্দ্রসঙ্গীত। অনেকটা দিন অবধি দুটো যেন সমান্তরাল ধারা এই মনে করেই চলছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীতেও ভাগ করে নিয়েছি দু’টি ধারার গান। সভাসমিতিতে যখন গাইছি ‘আগুণ জ্বালো‘ তখন রেডিওতে গাইছি ‘যদি এ আমার হৃদয়দুয়ার বন্ধ রহে গো প্রভু’। দু‘টি ধারার মধ্যে যেন কোনো যোগাযোগ নেই। আমি যেন এক পিরাদেল্লো কথিত স্প্লিট পারসোনালিটির মানুষ। ড০ জ্যাকেল এন্ড মিঃ হাইড।

একটা বয়সের পর মনে ধন্ধ লাগতে থাকল। কিছু গান প্রশ্ন তুলতে থাকল মনে। যেমন, ‘যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন সেইখানেতে চরন তোমার রাজে‘। কিংবা ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো‘। এই গানগুলি কি ঈশ্বরের মহিমা কীর্তন? নাকি যে মানুষগুলি সবার নীচে সবার পিছে সবার অধম সেই সবহারাদের ঈশ্বরত্বের উচ্চতায় উন্নীত করার আকাক্সক্ষা? তবে কী কোথাও যোগ সাধিত হয় আমার কাছে এতদিন পরস্পর সম্পর্কহীন সমান্তরাল গানগুলির মধ্যে? এই ভাবতে ভাবতেই চলে যায় দিন মাস বছর। কখনো প্রশ্ন করি নিজেকে রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর কি আচারশাসিত ধর্মের ইশ্বরই? নাকি অন্য আরো কিছু। এবং সেটা এমন কিছু যার সাথে কোথাও একটা সংলাপ রচনার অবকাশ রয়েছে প্রগতিভাবনার?

এমন ভাবতে ভাবতেই দিন পাল্টে গেল পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যজুড়ে শুরু হল প্রেতনৃত্য। বন্ধুরা বললেন, এবার কন্ঠ ছেড়ে গণসঙ্গীত গাইতে হবে বুঝলি? মানুষ বিভ্রান্ত, মানুষ আতঙ্কে। আতঙ্ক বন্ধুসুজনদের মধ্যে। এই ভয়ভাঙানোর কাজ শুরু করতে হবে। আবার পুরনো খাতা ঝেড়ে গানগুলিকে উদ্ধার কর। হলও, ফিরে এলো প্রচুর হারিয়ে যাওয়া গণসঙ্গীত। ভুলেই গিয়েছিলাম পল রোবসন গানটি। সভাসমিতিতে আবার গাইতে শুরু করলাম। কমরেডরা উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।
ফিরে এল অনেক অনেক রবীন্দ্রনাথের গান। এমন গান যাকে কখনো ভাবি নি সংগ্রামের সঙ্গী হিসেবে। কামদুনি থেকে পার্কস্ট্রিট- রাজ্যের দিকে দিকে নারীর ওপর সীমাহীন অত্যাচার যেন বিধিসম্মত হয়ে গেল। ক্ষমতার উচ্চ মিনার থেকে ভেসে আসা অমানবিক হৃদয়হীন কথাগুলি বুকের ভেতর অস্থিরতার ঢেউ তোলে। জাতীয় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের উদাসীন অমানবিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে রচিত হওয়া ‘কেন চেয়ে আছো গো মা মুখপানে‘ ঋত্বিক দেবব্রত বিশ্বাসের হাত ধরে বিভক্ত বাংলার আর্তনাদকে মূর্ত করেছিল একদিন। এবার সেটিই হয়ে উঠল কামদুনি-পার্কস্ট্রিট-উত্তর পশ্চিমবাংলায় আমাদের ক্রোধের সাঙ্গীতিক উচ্চারণ।

এমন করে আরো অনেক অনেক গান পেল নতুন চেহারা। নতুন মাত্রা। ২০১১ সালের ১৩ মে অবধি জনৈক সহকর্মী নিজেকে প্রায় আমার নেতার পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন। অনেকে তাকে অনভিপ্রেত গুরুত্বও দিচ্ছিলেন। বামপন্থার এতদিনের সাহচর্য তার অন্তস্থ সুবিধাবাদকে অনুমাত্রও দুর্বল করতে পারে নি। চাপা দেওয়া ছিল মাত্র। ১৩ মে পেরোতেই তিনি স্বমূর্তি ধারণ করলেন এবং আমাদের কর্মক্ষেত্রে বামপন্থী হেনস্থা ও দুর্বল করার প্রতিটি প্রয়াসের নিষ্ঠাবান সহযোগী হলেন। প্রাক্তন বন্ধুরা অনেকেই মুষড়ে পড়েন তার এই ভোলবদলে। এমন ঘটনা নানা জায়গায় ঘটতে থাকেই। বিমর্ষ বন্ধুদের এমন এক সমাগমে উজ্জীবনের গান গাইতে গিয়ে বিনা প্রস্তুতিতেই হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল চালাতেই উঠে এল ‘তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে‘ তা বলে ভাবনা করা চলবে না’। গান যত এগোয় তত নিজেই অবাক হই। অন্যকে উজ্জীবিত করব কি, এতদিনের পরিচিত গানটি যেন আমার কাছেই নতুন হয়ে আসছে, আমাকে প্রাণিত করছে আরো আরো বেশি করে। সুবিধাবাদের মনপবনে যারা সঙ্গত্যাগ করেছে তাদের একেক জনের মুখ মিছিলের মত চোখের সামনে ভাসতে থাকে।

এভাবেই এক একটি গান নতুন রূপ পেয়ে আঘাতে শোকে উজ্জীবনে প্রতিবাদে ভাষা দিয়েছে আমাকে। শাহবাগের আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে আকাদেমি অব ফাইন আর্টসের সামনে ছাত্রযুবদের সমাবেশে পরিচয় হয়েছিল একটি ঝকঝকে তরুণের সাথে। সপ্রতিভ সেই তরুণটি এমন যার চোখ কথা বলে, হাসি কথা বলে, তার চলা ফেরা যেন বাক্সময় করে তোলে প্রতিবেশকে। গানের আগে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে ফোন নম্বর চেয়ে নিল। হেসেই দিলাম। হঠাৎই একদিন টিভির পর্দায় ভেসে উঠল সেই মর্মান্তিক সংবাদ। আইন অমান্য আন্দোলনের পর পুলিসের কাস্টোডিতে থাকার সময় পুলিসেরই লাঠির ঘায়ে লুটিয়ে পড়ল তার অমূল্য প্রাণ। সে মৃত্যুহীনের নাম সুদীপ্ত গুপ্ত। দিন রাত শোকে গুমড়ে গুমড়ে ভেতরে বাজতে থাকল, ‘তরুণ হাসির আড়ালে কোন আগুণ ঢাকা রয়/ একী গো বিস্ময়, অস্ত্র তোমার গোপন রাখো কোন তূণে? এতদিন যে বসে ছিলেন পথ চেয়ে আর কালগুণে, দেখা পেলেম ফাল্গুণে‘।


ভেবেছি এবারের আমার জন্মদিনে সেই তরুণটিকে একটি চিঠি পাঠাবো। বলব, ‘হ্যাঁ, তোর কথা মতই গলায় তুলে নিয়েছি গণসঙ্গীত। তবে রবীন্দ্রনাথ যে এত গণসঙ্গীত লিখেছেন জানা ছিল না। আমাদের বাইরের ভেতরের সমবেত একক- নানা ধরণের সংগ্রামের সঙ্গীত জানিস তো রবীন্দ্রনাথও লিখেছেন। আমাদের দোষ আমরা কখনো সেভাবে শুনি নি। পড়িনি। চল আবার শুনি, পড়ি সেই গান‘।

বুধবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৪

কী হবে পশ্চিমবঙ্গে?

সারা দেশ যদিও মোদী প্রধানমন্ত্রী হবেন কিনা এই নিয়ে তর্কে মেতে আছে। তার মধ্যেই দেশের এক বড় অংশে মানুষের মধ্যে এটাও আগ্রহের বিষয়, কী হবে পশ্চিমবঙ্গে। বামপন্থীদের প্রতি যাদের কিছুটা হলেও দুর্বলতা রয়েছে , তারা তো আগ্রহী বটেই, আগ্রহী পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থাকা সাধারণ বাঙালিরাও। সারা দেশেরও এক বড় অংশের মানুষর মধ্যে জিজ্ঞাসা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল নিয়ে। তারা জানতে চায়, বামপন্থীরা কি ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি বড় বড় সংবাদপত্রের সমীক্ষা অনুযায়ী আরো দুর্বল হয়ে পড়বে বামপন্থীরা?



তবে এবারের নির্বাচন বিভিন্নভাবেই অভূতপূর্ব পশ্চিমবঙ্গের জন্যে। পশ্চিমবঙ্গের ভোট মানেই এতকাল আমরা জানতাম পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান, রাস্তার ঠেক, বাস ট্রাম ট্রেনে নির্বাচন নিয়ে অন্তহীন মুখরতা। প্রতিটি পরিসরে তর্কে ঝগড়ায় বিদ্রুপ ভাবাবেগ চেঁচামেচিতে মুখর থাকত মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতির এই মুখরতা দিয়েই বলা যায় বাইরের মানুষেরা এই রাজ্যকে চেনে। বাংলা সিনেমা গল্প উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধে পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক মুখরতার কত কত রূপায়ণ আমরা দেখেছি। এবার এই মুখরতাই উধাও হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। চায়ের দোকান, ট্রেন বাস ট্রাম পাড়ার রক আড্ডার ঠেক অফিসের টেবিল- সবত্র আশ্চর্যজনকভাবে বিরাজ করছে এক শীতল নীরবতা। কেউ কারো সাথে ভোট নিয়ে কোনো তর্ক করছে না, কোথাও কেউ বাজি ধরছে না ফলাফল নিয়ে, কোথাও কেউ কাউকে বিদ্রুপ করছে না, আবেগে গদগদ হয়ে কারো সমর্থনে গলাও ফাটাচ্ছে না কেউ। ট্যাক্সিওয়ালা রিক্সাওয়ালা সেলুনের কর্মচারী- যারা নাকি আগে এমন মরশুমে নির্বাচনী হাইলাইট এবং নানা ধরনের স্কুপ খবর দিয়ে স্বাগত জানাত গ্রাহকদের, তারা এবার কথায় বার্তায় এড়িয়ে যাচ্ছে নির্বাচনের প্রসঙ্গ। প্রশ্ন উঠতে পারে, এমন শীতলতা নেমে এল কেন? কেউ হয়ত বলবেন, রাজনীতি নিয়ে মানুষের বীতশ্রদ্ধ হওয়াই কারণ। না, এটা পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যমান পরিস্থিতির সত্য মূল্যায়ণ কখনোই নয়।


গ্রাম থেকে শহর হয়ে মহানগরের সমাজজীবনকে এই মুহূর্তে শাসন করছে এক সর্বগ্রাসী ভয়। এই ভয় শুধু যে বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থকের মধ্যেই তা নয়, ভয়ের আবহে বাস করছে অফিস আদালত ব্যবসা বাণিজ্য স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত মানুষেরা।  এমন কি এ থেকে মুক্ত নন চলচ্চিত্র নাটক সঙ্গীতের মত সৃষ্টিশীল কাজের সাথে জড়িয়ে থাকা বিশিষ্টজনেরাও। পেট্রোল বা ডিজেলের সামান্য দাম বাড়লেই বাসভাড়া পরিবহণ ভাড়া বাড়ানোর জন্যে যারা কথায় কথায় ধর্মঘট করত, তারা এখন শত চড়েও রা কাড়েন না। সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ ভাতার বড়ো একটি অংশ দীর্ঘদিন থেকে বকেয়া, সরকার স্পষ্টই জানিয়েছে, তারা দেবে না, পেনশন পাচ্ছেন না সরকারি নিগমের অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরা, ট্রেড ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের নানা জায়গায় বদলি করে দেওয়া হয়েছে, তবু পশ্চিমবঙ্গের ‘সংগ্রামী‘ শ্রমিক কর্মচারীরা নীরব, কোনো আন্দোলন নেই। যে সমস্ত সঙ্গীতশিল্পীরা আগের জমানায় অনুষ্ঠানে গানের ফাঁকে ফাঁকে নানা রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করতেন, অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদ করতেন, সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করতেন, তারাও এখন নীরব। অনুষ্ঠানে গানের পর গানই গেয়ে যান, সমাজ সংসার নিয়ে কোনো কথা বলেন না। যেন ‘সমাজ সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব‘! আসলে সবই ভয়ের সর্বগ্রাসী রাজ্যবিস্তারের ফল। ভয় এমন কি বিরাজ করছে যারা শাসকপক্ষের রাজনীতির সাথে যুক্ত তাদের মধ্যেও। প্রতিনিয়ত ভয়ে ভয়ে থাকেন নিজেদের অপর গোষ্ঠীর গতিবিধি নিয়ে। ভয় থেকে মুক্ত নন সম্ভবত ক্ষমতাসীন দলের ওপরতলার নেতৃবৃন্দও। এক গভীর অনিশ্চয়তায় কাটে তাদেরও ‘দিনরজনী‘। আজ যার প্রতি নেত্রীর অকুন্ঠ বিশ্বাস, যার শত অপরাধকে জনসমক্ষে সমর্থন করতেও পিছপা নন তিনি, পরিস্থিতির হঠাৎ পরিবর্তনে সেই আস্থাভাজন নেতাই পরের দিন হয়ত স্থান পেতে পারেন কারাগারের অন্ধকারে। বলা যায় না, হয়ত ভয় পেছন ছাড়ছে না প্রধানা নেত্রীকেও। কারণ শপথ নেওয়ার পর যিনি ঘোষণা করেছিলেন কোনো ধরনের পুলিসী নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকবেন না, এই মুহূর্তে তিনি যে মাত্রার পুলিসী নিরাপত্তা নিয়ে ঘোরাফেরা করেন, স্বাধীনতা উত্তর পশ্চিমবঙ্গে কোনো মুখ্যমন্ত্রীই এই পর্যায়ে করেন নি।


এই সর্বগ্রাসী ভয়ের আবহেই এবারের ভোট। এই নির্বাচনের আরো দু’টি বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েছে কারো কারো। প্রথমত, ২০০৯ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে এবং ২০১১ সালের নির্বাচনের সময় সাধারণ মানুষের এক বড়ো অংশের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তার দল তৃণমূল কংগ্রেস সম্পর্কে যে ইতিবাচক উচ্ছাস ছিল, তার অনেকটাই এখন স্তিমিত। কট্টর সমর্থকরা তাদের দিদিকে হয়ত আরেকটু সময় দিতে চান, কিন্তু সাধারণ সমর্থকরা যারা বামেদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে সোৎসাহে ভোট দিয়েছিলেন মমতার দলকে তারা কিছুটা হতাশ। এমনটা তারা চান নি। এই মানুষগুলির একটি অংশ ধীরে ধীরে ফিরে যাচ্ছেন বামশিবিরে। তবে এদের বড়ো অংশ, বিশেষ করে যারা ধর্মবিশ্বাসে হিন্দু, মনে করছে এই মুহূর্তে ভরসা করা উচিত নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বেই। তাদের একটা বাড়তি রাগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উচ্চকিত মুসলিম-রাজনীতি। সভা সমিতিতে কথায় কথায় ইনশাল্লাহ বলা, মাথায় হিজব পড়ে ধর্মীয় সমাবেশে হাজির হওয়া, মুসলিমদের জন্যে আলাদা হাসপাতাল করতে চাওয়া, কাজে কিছু না হলেও কিছুদিন পর পর আলাদা করে শুধু মুসলিমদের জন্যে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করা, এই সমস্ত কিছুর ফলে এই মানুষগুলির মধ্যে এক ধরনের চাপা হিন্দু-ভাবাবেগ তৈরি হচ্ছে। বাসে ট্রেনে চায়ের দোকানে অফিসে আদালতে যে কোনো আড্ডায় একটু প্রশ্রয় পেলেই আলোচনা সাম্প্রদায়িক দিকে মোড় নিচ্ছে। এমন প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক ভাবাবেগের প্রকাশ স্বাধীনতা-উত্তর পশ্চিমবাংলায় অভূতপূর্ব। মর্মান্তিক হলেও সত্য, চিরাচরিত বাম-ভোটারদের একটা অংশকেও ঘনিষ্ঠবৃত্তে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এই সাম্প্রদায়িক ভাবাবেগের শিকার হতে দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর্যায়ে হয়ত এর সরাসরি প্রকাশ ঘটবে না, কারণ তাদের এই আচরণটা যতটা রাজনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি মানসিকতার।


অনেক কথার পর এবার আশা যাক ফিরে কী হবে পশ্চিমবঙ্গে এই আলোচনায়। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে যে মতামত সমীক্ষাগুলি প্রকাশিত হচ্ছে তার মোদ্দা কথা প্রধানত তিনটি। এক, সব দলকে ছাড়িয়ে এখনও অনেকটা এগিয়ে আছে তৃণমূল। দুই, বিজেপির ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং তিন, বামেদের আরো শক্তিক্ষয় হবে। এই সমীক্ষাগুলি নানা কারণেই বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। প্রথমত, জাতীয়স্তরেই এটা এখন প্রমাণিত সত্য যে, বৃহৎ সংবাদ মাধ্যমগুলি কর্পোরেট মহলের অর্থানুকূল্যে এবার অতীতের তুলনায় অনেকবেশি পূর্ব-নির্ধারিত মতকে প্রচার করছে সমীক্ষা এবং প্রতিবেদনে। এই পূর্বনির্ধারিত মতকেই তুলে ধরা হচ্ছে সত্য হিসেবে। এই মুহূর্তে কর্পোরেট মহলের নয়নমণি নরেন্দ্র মোদী। মোদীর প্রতি তাদের দুর্বলতা এতটাই প্রবল যে নিজের দল তাকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার বহু আগেই তারা তাকে ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করে দিয়েছে। অন্যভাবে বলা যায়, এই মহলের চাপেই একাধিক প্রবীণ নেতার মতামতের বিরুদ্ধে গিয়েই নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে শেষ পর্যন্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে তার দলও। সাধারণের অভিমত সত্যিই কি উঠে আসছে মতামত সমীক্ষাগুলিতে এই নিয়ে সারা দেশজুড়েই নানা সন্দেহ সংশয়। এমন সন্দেহ প্রকাশিত হতে পারে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সমীক্ষা নিয়েও। যে সমীক্ষাগুলি প্রকাশিত হয়েছে তা কতটা বাস্তবসম্মত? প্রথমত, যে অভূতপূর্ব ভয়ের বাতাবরণ বিরাজ করছে এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে তাতে মানুষের মতামত সমীক্ষা বস্তুনিষ্ঠ হবে তার গ্যারান্টি কতটা? ধরা যাক, আধুনিক সংখ্যাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিকতম প্রণালীর মাধ্যমে সেই বাধাগুলিকেও দূর করা হল। তারপরেও এই প্রকাশিত সমীক্ষাগুলিকে একটু মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করলে ধরা পড়বে নানা ত্রুটি। খুঁজে পাওয়া যাবে একদেশদর্শিতার নানা দৃষ্টান্ত।


২০১১ সালের নির্বাচনে যখন স্মরণাতীত কালের মধ্যে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে বামপন্থীরা বিদায় নেয়, তখন তৃণমূল কংগ্রেস-কংগ্রেস জোটের মোট ভোট ছিল ২৩,০৮৫,২১৩ এবং সর্ব অর্থে পর্যুদস্ত বামফ্রন্টের মোট ভোট ছিল ১৯,৫৫৫,১৩৫। দু’টি জোটের ভোটের ব্যবধান ছিল ৩,৫৩০,০৭৮।  শতাংশের বিচারে তৃণমূল জোট পায় ৪৮.৫৪% এবং বামফ্রন্ট পায় ৪১.১২%। পশ্চিম বাংলার সংবাদ মাধ্যমে একটি মত প্রায়শই ব্যক্ত করা হয়, যা মূলত রাজ্যের বর্তমান শাসকদেরও মত। এই মত অনুযায়ী ২০১১ সালের পরাজয়ের পর বামপন্থীদের সমর্থন ক্রমেই হ্রাস পেয়ে চলেছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই অনুমান কতটা বাস্তবসম্মত?


এবারের ভোটেই প্রথম একক শক্তিতে তৃণমূল লড়ছে। স্মরণ করা যেতে পারে বিগত কোনো লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনেই তারা একা লড়ে নি। কখনো বিজেপি কখনো কংগ্রেসের সাথে জোটে ছিল তৃণমূল। ২০১১ সালের তৃণমূল জোট ছিল আরো বড়ো। তাতে কংগ্রেস থেকে শুরু করে এসইউসিআই পর্যন্ত অনেকেই ছিল অন্তর্ভুক্ত। ২০১৪ সালের নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে পূর্বাভাস করতে গিয়ে বিভিন্ন সমীক্ষায় তৃণমূলের সম্ভাব্য ভোটের পরিমাণ বলা হয়েছে ৩৬%-৩৮% শতাংশ। হেডলাইনস টুডে চ্যানেলের সমীক্ষায় তৃণমূলের সম্ভাব্য ভোটের হার বলা হয়েছে ৩৪%। ওই চ্যানেলের অনুষ্ঠানেই নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তৃণমূলের সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, তৃণমূল ভোট পাবে ৪০% শতাংশ। অর্থাৎ তৃণমূলের সাংসদই স্বীকার করে নিয়েছেন ২০১১ সালের তুলনায় এবার তাদের ভোট কমবে ৮% এর কাছাকছি। এই সমীক্ষায় আরো বলা হয়েছে কংগ্রেসের ভোট ২০০৯ সালে পাওয়া ১৩.৫% থেকে বেড়ে হবে ১৭% এবং বিজেপির ভোট ৬.১% থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১৯%। এই হিসেবের সাথে সঙ্গতি রাখার জন্যেই সম্ভবত তারা বামেদের সম্ভাব্য ভোট অনুমান করছেন ২৩%। বলা বাহুল্য, এই সমীক্ষাটি ত্রুটিপূর্ণ। ২০০৯ সালের যে ভোটকে কংগ্রেসের ভোট বলে অভিহিত করা হয়েছে, তা মোটেই কংগ্রেসের একক ভোট নয়। তৃণমূলের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে লড়া সেই নির্বাচনের ভোটে যোগ করা আছে তৃণমূলের ভোটও। একইভাবে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল-কংগ্রেস জোটের ৪৮% ভোটের মধ্যে নয় নয় করেও রয়েছে কংগ্রেসের অন্তত ১০% শতাংশ ভোট এবং এসইউসিআই-এর মত ছোট দলের ০.৮ শতাংশ থেকে ১% শতাংশ ভোট। সুতরাং ২০১১ সালের নিরিখেও পাটিগণিতের হিসেবেই তৃণমূলের একক ভোট ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১১%-১২% কমে যাওয়ার কথা।


বামপন্থীদের ভোট সম্পর্কে পূর্বানুমান করার আগে কয়েকটি তথ্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন। ২০১১ সালে বামেদের যে ভরাডুবি হয় তার সবচেয়ে বড়ো আঘাত ঘটে হুগলি, হাওড়া, কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায়। হুগলি জেলায় তৃণমূল জোটের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল প্রায় ৫৯%। ২০১১ সালের পর কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে প্রথম বড় ভোট হয় ২০১৩ সালে হাওড়া সংসদীয় আসনে। ২০০৯ সালে এই আসনে বামফ্রন্ট পরাস্ত হয়েছিল ১,৮৪,০০০ ভোটে। শতাংশের হারে বামফ্রন্টের ভোট ছিল ৪৩.৮৫%। ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটের সময় এই ভোট আরো হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৩৭%-এ। বিপর্যয়ের এই ধরনটি ব্যাপ্ত ছিল মেদিনীপুর থেকে হুগলি হাওড়া হয়ে কলকাতা দুই চব্বিশ পরগণা অবধি।  তৃণমূল সাংসদ অম্বিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর হাওড়ায় উপনির্বাচন হলে সেখানে জয়ী হন তৃণমূল প্রার্থী প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয়, তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান এক ধাক্কায় ১,৮৪,০০০ থেকে নেমে আসে ২৭,০০০-এ। ৩৭% থেকে বামেদের ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ৪১.৮৫%। চমকপ্রদ একটি তথ্য এখানে যুক্ত করা যেতে পারে, এই উপনির্বাচনে শেষ মুহূর্তে বিজেপি তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেয়। ২০১৩ সালের যে পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে বামেদের বা এক অংশের সংবাদ মাধ্যমেরও প্রচুর অভিযোগ, সেখানেও একটু গভীরে আলো ফেললে অনেক চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসবে।


নির্বাচন অবাধে হয়েছে কি না, তা আলাদা করার জন্যে আমরা সেই সমস্ত জেলা পরিষদের আসনের দিকে নজর দিতে পারি, যেখানে গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি থেকে জেলা পরিষদ অবধি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন সম্পন্ন হয় নি। এই ধরনের আসনের ফলাফলের বিচার করলে দেখা যাবে ২০১১ সালের তুলনায় অনেকটাই ভোট বেড়েছে বামেদের এবং একইভাবে হ্রাস পেয়েছে তৃণমূলের ভোটও। ২০১১ সালে বামেদের সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় হওয়া জেলাগুলির অন্যতম উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা। বাসন্তী হাইওয়ের দু’ধারে দুই চব্বিশ পরগণার নিচের স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এমন একান্নটি জেলা পরিষদ আসন এলাকা বাদ দিয়ে উত্তর ২৪ পরগণার ৩১টি (মোট আসন ৫৭) ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার ৫৬টি (মোট আসন ৮১) জেলা পরিষদের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বামেদের প্রাপ্ত ভোট ৪৩.৫%, যা ২০১১ সালের তুলনায় প্রায় ৪%-৫% বৃদ্ধি বেশি। কারচুপির অভিযোগগুলিকে যদি নাও মানি তবেও সামগ্রিকভাবেই পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামফ্রন্টের মোট প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ৩৯%, যা ২০১১ সালে তুলনায় মাত্র ২% কম। এই সংখ্যাকে প্রকৃত অবস্থার সূচক ধরে নিলেও হেডলাইনস টুডে সহ বিভিন্ন সমীক্ষায় বামফ্রন্টের প্রায় ১৮%-২০% ভোট হ্রাস পাওয়ার অনুমানটি ভিত্তিহীন বলেই ধরে নিতে হবে। নির্বাচনী হিসেব ছাড়াও বা দিলেও সাদা চোখেই দেখা গেছে গত এক বছরে বামেদের যে সমস্ত সভা সমাবেশ মিছিল আন্দোলনে আগেকার তুলনায় অনেক বেশি মানুষকে যোগ দিতে।


এই নির্বাচনে বিজেপি-র ভোট বাড়বে এই নিয়ে কোনো পক্ষেরই মতপার্থক্য নেই। কিন্তু এই ভোট কতটা বাড়বে এবং সেটা কাদের ভোটের ক্ষয় ঘটিয়ে ঘটবে, এ নিয়ে সমীক্ষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সর্বোপরি, বিজেপি-র এই শক্তি বৃদ্ধি কি আসন প্রাপ্তিতে পরিণত হবে নাকি সীমাবদ্ধ থাকবে অন্য দলের পরাজয়ের কারণ হয়ে, তা নিয়েও নানা মত রয়েছে। এটা ঠিক পশ্চিমবঙ্গের একটি অংশের মানুষ গভীরভাবেই চাইছে নরেন্দ্র মোদীকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। তবে এদের এই চাওয়ার রাজনৈতিক বাস্তবায়নের পথে বাদ সাধছে রাজ্যে বিজেপির সাংগঠনিক দুর্বলতা। সারা দেশে যাই হোক, এখানে নিজেদের কোমরের জোরে লোকসভার আসন তারা জিততে পারবেন এমন ভরসা সাধারণ মানুষের মধ্যে নেই। সাম্প্রতিককালে সাধারণভাবে হিন্দু-ভাবাবেগে ভেসে যাওয়া মানুষদের বেশিরভাগ অংশটি গতবারের ভোটে ছিলেন তৃণমূলের পক্ষে। মমতার উচ্চকিত মুসলিম-রাজনীতিতে এরা হতাশ হয়েই এমন ভাববেগের শিকার হয়েছেন। বাবুল সুপ্রিয় বা বাপী লাহিড়ীর মত প্রার্থীর প্রচারে যে একটা হাওয়া কিছুটা উঠেছে তা শেষ পর্যন্ত সংগঠিতভাবে কতটা ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হবে তা নিয়ে এই নতুন সমর্থকেরা কিছুটা ধন্দে। এই মুহূর্তে ভাসমান ভোটারের বৃহত্তর অংশ তারাই।


দক্ষিণবঙ্গের বেশির ভাগ অঞ্চলে ২০১১ সালে ভোটের নিরিখে বিজেপির উপস্থিতি নিতান্ত সামান্যই। দক্ষিণবঙ্গে বোলপুরের মধ্যেকার ময়ূরেশ্বর,বীরভূম আসনের অন্তর্ভুক্ত  রামপুরহাট, বসিরহাটের সন্দেশখালি, বর্ধমান-পূর্ব আসনের পূর্বস্থলী-উত্তর, হাওড়ার হাওড়া-উত্তর ও উলুবেড়িয়া আসনের উলুবেড়িয়া-পূর্ব, কলকাতা-উত্তরের জোড়াসাঁকো বিধানসভা চক্র ছাড়া আর কোথাও তারা দশ শতাংশের বেশি ভোট পায় নি। বাকি সমস্ত বিধানসভা এলাকায় তারা ভোট পেয়েছে গড়ে পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি। তবে উল্লেখ্য, ২০১১ সালে উত্তরবঙ্গের বাকি আসনগুলির মধ্যে আলিপুরদুয়ার লোকসভা আসনের অন্তর্ভুক্ত মাদারিহাটে ২৬%, মালদা-উত্তরের হাবিবপুরে ২০% এবং মালদা-দক্ষিণের ফরাক্কায় ১৯% শতাংশ ভোট পেয়েছিল বিজেপি। দশ শতাংশের আশে পাশে ভোট পেয়েছিল আলিপুরদুয়ারের তুফানগঞ্জ, কুমারগ্রাম, জলপাইগুড়ি আসনের মধ্যেকার ধূপগুড়ি, মালদা-দক্ষিণের বৈষ্ণবনগর ও বহরমপুরের বেলডাঙায়। এবারের নির্বাচনের প্রাক মুহূর্তে কিছু সর্বভারতীয় আদিবাসী সংগঠন বিজেপির প্রতি সমর্থন জানানোয় ২০১১ সালের হিসাবে আরো চার পাঁচটি বিধানসভা এলাকায় বিজেপি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় যেতে পারে বলে মনে হতে পারে। ২০০৯ সালের প্রাপ্ত ভোট ৬% থেকে বিজেপি যদি সত্যিই ১৯% এর কাছাকাছি ভোট পায় তবে এই ভোটটি তারা কোথা থেকে পাবে? অর্থাৎ কাদের ভোট ক্ষয়ের মাধ্যমে এই সংখ্যায় পৌঁছবে বিজেপি? নিজেদের বিচ্ছিন্ন পকেট ছাড়াও বিজেপির সম্ভাব্য সম্প্রসারণের এলাকা সারা রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হিন্দিভাষী ভোটাররা। এদের মধ্যে বিজেপির প্রতি সমর্থনের প্রবণতা লক্ষ্যও করেছেন অনেকে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলির পূর্ববঙ্গীয়মূলের ভোটারদেরও মনে করছেন অনেকে বিজেপির সম্ভাব্য নতুন ভোটার। এ ছাড়াও নদীয়ার তেহট্ট, উত্তর ২৪ পরগণার দেগঙ্গা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণার ক্যানিং অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয়ভাবে কতগুলি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। এই অঞ্চলগুলিতে পরবর্তী সময়ে সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখা গেছে বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের নানা সংগঠনকে। এর ফলে এই অঞ্চলগুলিতেও খানিকটা হলেও হিন্দু ভাবাবেগকে কাজে লাগাতে পারে বিজেপি। তবে যে সমস্ত বিধানসভা এলাকার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করা হল ২০১১ সালের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বিগত নির্বাচনে এর সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটই গিয়েছিল তৃণমূল-কংগ্রেস জোটের বাক্সে। ফলে এই সমস্ত অঞ্চলে পক্ষ পরিবর্তনের ঘটনা ঘটলে  দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তৃণমূলই। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ মিলিয়ে সব ক’টি লোকসভা আসনে এভাবে গড়ে ৬%-৮% ভোট তৃণমূলের থেকে সরে যেতে পারে বিজেপি-র দিকে। অন্যদিকে তৃণমূলের বাড়তি ক্ষতি কংগ্রেসের সাথে জোটের অবসান।


এটা ঠিক এই মুহূর্তে সারা দেশেই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে হাওয়া বইছে। এখানে বিজেপি-র উত্থান যদি জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন হয়, তবে একই অনুষঙ্গে এই রাজ্যে কংগ্রেসের সমর্থনভিত্তিতেও ক্ষয় আসার কথা। এ ছাড়াও সংসদীয় পদের টোপ, অর্থকরী প্রাপ্তির প্রলোভন দেখিয়েও উত্তর থেকে দক্ষিণ বঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তিকে অনেকটাই কোণঠাসা করে দিয়েছে তৃণমূল। এই শক্তিহীনতার প্রতিফলন কিছুটা ভোটে নিশ্চয়ই পড়বে।  তবে সাংগঠনিক শক্তি যতই কমুক সারা রাজ্যে গড়ে ন্যূনতম ৮%-১০% ভোট কংগ্রেসের বাক্সে পড়বেই। বলা বাহুল্য এই ভোটও তৃণমূল-কংগ্রেস জোটের ২০১১ সালে পাওয়া ৪৮% ভোটকেই ক্ষয় করবে। এই সমস্ত বিয়োগ ফলের পর ২০১৪ সালের ভোটে তৃণমূলের ফলাফল যা দাঁড়াবে তা আর যাই হোক সর্বভারতীয় সমীক্ষার অনুরূপ হবে না তা একরকম নিশ্চিতই।



আমাদের অভিজ্ঞতা বলে নির্বাচনী ফলাফল শেষ পর্যন্ত সবসময়ই প্রচুর চমক নিয়ে আসে। এবারের পশ্চিমবঙ্গের ভোটে সেই চমকের একটি হয়ত হবে ছোট পরিসরে হলেও বিজেপির উত্থান। আসনের বিচারে বিরাট কিছু না হলেও ভোটের শতাংশের বিচারে তা অবশ্যই হবে উল্লেখযোগ্য বিষয়। এ ছাড়া আরো দু’টি চমক হয়ত আসবে আগামী মাসের ১৬ তারিখ দিনটিতে। এক, তৃণমূলের শক্তিহ্রাস এবং দুই, নিশ্চিতভাবেই বামপন্থীদের পুনরুত্থান। যার প্রভাব পরবর্তী দিনগুলির জাতীয় রাজনীতিতে পড়তে বাধ্য।

রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

একুশ, শাহবাগ ও আমরা

এবারের একুশে এসেছি আমার নিজের মাটি আসামের বরাক উপত্যকায়। সীমান্ত-শহর করিমগঞ্জের অদূরে ছোট জনপদ বারৈগ্রাম। উনিশো একষট্টির ভাষা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী এই জনপদ। এই জায়গারই সন্তান প্রভাংশু দত্ত। আজীবন অধ্যাপনা করেছেন বদরপুর কলেজে। বামপন্থী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের সংগ্রামী মানুষ। অধ্যাপক আন্দোলনে অংশ নিয়ে বেশ কয়েক বছর ছিলেন বরখাস্ত অবস্থায়। সম্প্রতি চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছেন। চাকরি জীবনের শেষে সারা জীবনের উপার্জন থেকে কুড়ি লক্ষ টাকা দান করেছেন পার্টির তহবিলে। আরো দশ লক্ষ টাকা দান করেছেন বারৈগ্রামে এক বিশাল ভাষা শহীদ স্মারক তৈরি করার জন্যে। করিমগঞ্জ জেলার পার্টি উদ্যোগ গ্রহণ করে শামিল করেছেন সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে। অংশ গ্রহণ করিয়েছেন বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদেরও। শহীদ স্মরণ সমিতি গঠন করে এক বিশাল সুদৃশ্য শহীদ স্মারক তৈরি করানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বারৈগ্রামের জফরগড় স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুলের ভেতরে এই শহীদ স্মারক বসানোর অনুমতি দিয়েছেন। আজ একুশের সকালে বরাক উপত্যকার বৃহত্তম শহীদ স্মারকের আবরণ উন্মোচন করলেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সোমনাথ দাশগুপ্ত। শহীদ স্মরণ সমিতি সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন, এই শহীদ স্মারক শুধু একুশের বা বরাকের ভাষা সংগ্রামের উনিশের শহীদদের স্মৃতিতে উৎসর্গীকৃত নয়। সারা পৃথিবীর সমস্ত ভাষা শহীদদের স্মৃতিতে এই স্মারক নির্মিত হয়েছে। ভাষা শহীদ স্মারকের উন্মোচনের পর আলোচনা সভায় বক্তাদের বক্তব্যে উঠে এল সারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা সংগ্রামের কথা। উনিশে বাহান্ন সালের একুশের সংগ্রাম আর বরাকের একষট্টি বাহাত্তর ছিয়াশি ও ছিয়ানব্বুই সালের ভাষা সংগ্রামের শহীদরা মিলেমিশে গেলেন। অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক আসামের মন্ত্রী সিদ্দেক আহমেদও। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বরাকের শিল্পীদের পাশাপাশি অংশ নিলেন বাংলাদেশ থেকে আসা লোকশিল্পীরাও। এমন এক বিরাট কর্মযজ্ঞ সম্ভব হয়েছে একটি মানুষের এই মহৎ অবদানের জন্যেই। আমাদের সমাজে যাঁরা বিরাট ধনসম্পদের অধিকারী তাঁরা তাঁদের আয়ের একটি অংশ মহৎ নানা সামাজিক কাজে ব্যয় করে থাকেন এটা কোনো বড়ো কথা নয়। আজকাল এই অঞ্চলে কালোটাকার মালিক রাজনৈতিক নেতারা কথায় কথায় টাকা দান করেন। প্রভাংশুবাবুর ব্যাপারটি তা নয়। তিনিই মোটেই ধনাঢ্য ব্যক্তি নন, সাধারণ  মধ্যবিত্ত সংসারী মানুষ। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক চেতনা ও গভীর মানবিক আবেগ এটাই শিখিয়েছে জীবন শুধু নিজের জন্যে বা নিজের পরিবারের জন্যে নয়। নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা। তাঁর জন্যেই এবারের একুশের সকাল দুপুর রাত এ অঞ্চল উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। তবে একুশ বা উনিশ তো শুধু আবেগের প্রকাশ নয়, সাংস্কৃতিক রাজনীতির লড়াইয়ের অভিন্ন অংশ।
         
  ওপারে বাংলাদেশে একুশ এবার এসেছে এক রক্তঝরা সময়ের মধ্যে। একদিকে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ একুশের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দীক্ষিত হয়ে বাংলাদেশের সমাজকে মৌলবাদ ও ঘাতক দালালদের হাত থেকে মুক্ত করতে মুখর হয়েছেন। অন্যদিকে এর উত্তরে বাংলাদেশের মৌলবাদী ঘাতক দালালরা ও তাদের দোসর রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশকে রক্তাক্ত করে তুলেছেন। বাংলাদেশে সবসময়ই একুশের উদযাপন নিছক শহীদ স্মরণ হিসেবে উদযাপিত হয় না। প্রতিবারই এই দিনকে তাঁরা উদযাপন করেন বিদ্যমান সময়ের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বাস্তবতার বুকে দাঁড়িয়ে। একুশের সংগ্রামকে তাঁরা নবীকরণ করেন চলমান সময়ের সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে। গতবার একুশ ও শাহবাগ ছিল একে অপরকে জড়িয়ে। একুশের উদযাপনে ছিল শাহবাগের সংগ্রামের ছায়া। তরুণ সংস্কৃতিকর্মী রাজীব হায়দার তখন সদ্য শহীদ হয়েছেন জামাতের কর্মীদের হিংস্র আক্রমণে জীবন দিয়ে। উনিশো সাতচল্লিশের ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অন্ধ আবেগকে সঙ্গী করে। দ্বিজাতি তত্ত্বের মোহাচ্ছন্ন ওপারের বাঙালি মুসলিম জেনেছিল জাতি নির্মিত হয় ধর্মের ভিত্তিতে, ভাষার ওপরে নয়। উনিশো বাহান্নর ভাষা সংগ্রাম ওপারের বাঙালিকে মুক্ত করল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্ধগলি থেকে। একুশ বার্তা দিল অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের। ওপারের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা এই বাঁক বদলকে বলেন, ওপারের বাঙালির ঘরে ফেরা। এই অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের পথে হেঁটে এগিয়েই রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান রূপান্তরিত হল বাংলাদেশে। ২০০০ সাল থেকে একুশ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রসঙ্ঘের ঘোষণার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই নানা ভাষী মানুষরা পালন করছেন এই দিন। প্রশ্ন উঠতে পারে ২০০০ সালের আগে একুশের কতটা তাৎপর্য ছিল আমাদের রাজনীতির জন্যে বা সংস্কৃতির সংগ্রামের নিরিখে। ওটা কী ছিল শুধুই ওপারের বাঙালির একটা অর্জন? শুধুমাত্র অভিন্ন মাতৃভাষার জন্যেই আমাদের কর্তব্য ছিল ওই দিন পালনের এর বাইরে কী কোনো তাৎপর্য ছিল ওই দিনের আমাদের জন্যে? এটা ঠিকই ওই দিনটি বাঙালির ভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনের একটি মাইল ফলক। তবু এর তাৎপর্য আরো গভীরে। আমরা মনে করতে পারি উনিশো পাঁচ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পথে নেমেও পরে সরে গিয়েছিলেন। সরে গিয়েছিলেন এজন্যেই, তিনি দেখতে পেয়েছিলেন বাঙালির মজ্জার ভেতরে যুগ যুগ ধরে গেড়ে বসে আছে বিভাজনের চিহ্ন। হিন্দু বাঙালি ও মুসলিম বাঙালি পাশাপাশি বাস করেও রয়েছে দূরত্বে। এই দূরত্ব থেকেই জন্ম নিয়েছে দ্বিজাতি তত্ত্বের ধর্মীয় রাজনীতি। একুশ শুধু ভাষার অধিকারকেই প্রতিষ্ঠিত করে নি। রবীন্দ্রনাথ ‘ব্যাধির প্রতিকার` প্রবন্ধে যে ব্যাধির কথা বলেছিলেন, সেই ব্যাধির প্রতিকারের পথেই হেঁটেছিল একুশ, শাহবাগ তাঁকেই পূর্ণতা দিতে চেয়েছে ঘাতক-দালাল মৌলবাদীদের বিচার ও শাস্তির মধ্যে দিয়ে। এই লড়াইয়ের তাৎপর্য এপারেও অপরিসীম। এই বঙ্গে এখনো ‘ব্যাধির প্রতিকার` হয় নি। এখনো হিন্দু-বাঙালি ও মুসলিম-বাঙালি পাশাপাশি বাস করেও রয়েছে দূরত্বে। বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য নির্মানের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। এই কাজে একুশ আমাদেরকে আলো দেখাতে পারে।

শাহবাগ নিয়ে আমাদের প্রাথমিক উচ্ছাসের সীমা ছিল না। কিন্তু এই মুহূর্তে এ দেশে অনেকেরই ধারণা শাহবাগের লড়াই ব্যর্থ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কোন মাটিতে দাঁড়িয়ে শাহবাগের তরুণরা কোন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন তা তাঁরা জানতেন। কিন্তু এপারে অনেকেরই ধারণা ছিল, যে দ্রুততায় শাহবাগে লক্ষ জনতার জমায়েত হয়েছে, সেই দ্রুততাতেই বোধহয় মৌলবাদীরা বাংলাদেশে নিঃশেষ হয়ে যাবে। ঘটনাটি ওভাবে ঘটেনি বলে এখানে অনেকের ধারণা শাহবাগ ব্যর্থ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে শাহবাগ তো ব্যর্থ হয়ই নি, বরং শাহবাগের লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালির প্রতি গৃহকোণে। আজকের বাংলাদেশের রাজনীতি সংস্কৃতি ও সমাজজীবনে মৌলবাদী ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কী স্থান হবে তা নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সর্বত্র। এমন কি জামাত-সম্পৃক্ততার বিষয় নিয়ে বিএনপি দলে নেতৃত্ব থেকে নীচের স্তর পর্যন্ত বিতর্ক ছড়িয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ নিয়ে এমন বিস্তৃত আলোচনা ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েনি বাংলাদেশের সমাজ। এখানেই শাহবাগের উপস্থিতি এবং সাফল্য। আজ আমাদের এ পারে যখন দাঙ্গাবাজ অতীতকে ভুলিয়ে দিয়ে উন্নয়নের মুখোস পড়ে নির্বাচনী আসরে নেমেছেন নরেন্দ্র মোদী ও তার দল, তখন ওপারের ওই সংগ্রাম বিতর্ক কী আমাদের জন্যে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে না? শুধু নরেন্দ্র মোদী কেন, মুসলিম সমাজের পশ্চাদপদতাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে সুক্ষ্ম সাম্প্রদায়িকতা ও পৃথকত্বের রাজনীতি করছেন, সেখানেও কী শাহবাগ বা একুশ আমাদের পথ দেখাতে পারে না? স্মরণ করা যেতে পারে, ওপারে যখন শাহবাগের লড়াই চলছে তখন এখানে মৌলবাদীরা শাহবাগ-বিরোধী জমায়েত মিছিল করেছেন। এই প্রচেষ্টাগুলি নেপথ্যে ছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দলের নীরব আশীর্বাদ। এটা অজ্ঞানতা প্রসূত কোনো ঘটনা নয় বলা বাহুল্য। কারণ কেউ জানুক আর না জানুক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল জানে, শাহবাগের বাতাস এপারের হিন্দু ও মুসলিম সমাজকে ছুঁলে তাঁর রাজনীতি দুর্বল হবে। কারণ মৌলবাদ বিরোধিতা গণতন্ত্রের পথ সুগম করে। আর সমাজের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের সুবাতাস বয়ে যাওয়া মানে ফ্যাসীবাদের দিন শেষ।


এ জন্যেই একুশ উদযাপন, শাহবাগের প্রতি সহমর্মিতা প্রগতিপন্থীদের জন্যে একটি জরুরি রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কাজ।

‘মসীহা’র প্রবেশ ও আমার প্রস্থান

শিলচর ছাড়ার পর এত ঘনঘন আর কখনো আসি নি শিলচরে পুজোয় প্রায় প্রতিবার আসি, যেমনটা আসি উনিশে মেতে এবার পুজোর পর থেকে পাঁচ নম্বর বার এলাম গত উনিশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্য একুশের সকালে বারৈগ্রামের শহীদ স্মারক উন্মোচন অনুষ্ঠান এসেই দেখি বরাক জমজমাট একুশের আগের দিন আসছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, পরের দিন আসছেন প্রধানমন্ত্রী-পদাভিলাষি আরেক মুখ্যমন্ত্রী বিমানবন্দর থেকে শহর অবধি রাস্তার দুধার ব্যানারে ব্যানারে সয়লাব মুখ্যমন্ত্রী গগৈর ছবি চেনা, প্রধানমন্ত্রীর পদাভিলাষী মোদীর ছবিও সম্যক চেনা এই দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর আগমনকে বজ্রনির্ঘোষে জনসমাজে বিজ্ঞাপিত করার জন্যে আরো অনেক ছবি প্রতিটি ব্যানারে

ছবি দেখতে দেখতে মালুম হয়, আমার জেনারেল নলেজটা অনেকদিন ঝালানো হয় নি ব্যানারের বড়ো ছবির নীচে ততটা-ছোটো-না- করেও-ছোটো অন্য ছবিগুলির অনেকগুলিই আমার অপরিচিত গগৈ এর আগমনী ব্যানারের একটা গণতান্ত্রিক চরিত্র রয়েছে মানে নীচের ছোটো ছবিগুলির মানুষেরা সংখ্যায় সবাই সবাইকে টেক্কা দিচ্ছেন কারোরই একাধিপত্য নেই তুলনায় মোদীর আগমনী ব্যানারে আমার অপরিচিত একটি ছবির দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় দৃশ্যমান দুটো সম্ভাবনা রয়েছে ক্ষেত্রে হয়ত দল থেকে তাঁকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছেমোদীজী‘-কে স্বাগত জানাতে অথবা এলেমের দিক থেকে হয়ত তিনি অন্য সবাইকে টেক্কা দিয়ে গেছেন পরে শুনলাম ভোট এলেই বাইরে থেকে এসে শিলচরের পাড়ায় পাড়ায় পথের মোড়ে যিনি চোস্ত হিন্দিতে বিজেপি- হয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন, ছবিটি তাঁরইতাঁর কন্ঠটি আমার চেনা অনেক দিনের, যদিও ছবিটি নয় আসলে আমাদের বরাকের বঙ্গভাষী মানুষের বেশিরভাগের হিন্দিজ্ঞানখায়গা যায়গাপেরোয় না সেখানে কাউকে স্থানীয় পথসভায় নিখুঁত উত্তর ভারতী ঢঙে হিন্দি বলতে শুনলে মনে দাগ কেটে তো যাবেই এই অভ্যর্থনাকারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ত্ব সেদিনই ছবিতে চোখে দেখলাম, যদিওবাঁশি শুনেছিঅনেকদিনই শহরে বাড়ি ওবাড়ি চায়ের দোকান চায়ের দোকানে ঘুরে ঘুরে দেখলাম শহর সরগরম মোদীকে ঠেকাতে গগৈ নাকি এক হাজার কোটি টাকারএক অব্যর্থ টোটকা‘ নিয়ে আসছেন মোদীপ্রেমীদের মুখে শুনলাম উদ্বেগ, ডি-ভোটার নিয়ে বলবেন তোমোদীজী’? নয়ত কেলেঙ্কারি! বাঙালি হিন্দু যে আশায় বুক বাঁধছে তাঁকে ঘিরে সেখানে এই প্রশ্নে নীরবতা একটু বেশি রিস্কি হয়ে যেতে পারে গুয়াহাটির সভায় সব বলেছেন, কিন্তু এই মুহূর্তে রাজ্য তোলপাড় করা ডি-ভোটার ইস্যু নিয়ে তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করেন নি পরের দিনই রাজ্য জুড়ে তুমুল হৈচৈহিন্দু-হৃদয়-সম্রাট মোদীজীরাজ্যের বাঙালি হিন্দুদের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া এই সমস্যা নিয়ে কিস্যুটি বললেন না কেন? মামার বাড়ি গিয়ে শুনলাম, জনৈক বিজেপি নেতা নাকি পরে সাংবাদিকদের বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘মোদীজীকে বক্তৃতার জন্যে যে পয়েনন্ট্স্ লিখে দেওয়া হয়েছিল তাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল ডি-ভোটারের সমস্যার কথা সময়ের অভাবে তিনি সেখানে ওই বিষয়ে কিচ্ছু বলতে পারেন নি শিলচরের জনসভায় আশা করা যাচ্ছে তিনি ডি-ভোটার নিয়ে কিছু বলবেন

পাশেই বসেছিলেন এক মোদী-বিরূপ এক বন্ধু তিনি বললেন, আর নতুন কথা কি কংগ্রেস বিজেপি সব্বাই- তো ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় এক কথা আর বরাকে এলে অন্য কথা বলেন এখানে এলে যাঁদের বাঙালিদের দুঃখে নয়ন ভেসে যায়, তাঁরাই ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় গিয়ে নানা প্রশ্নে বাঙালি-বিরোধী অবস্থান নেন আসাম আন্দোলনের সময় যখন গুয়াহাটিতে অঞ্জন চক্রবর্তী, দুলিয়াজানে রবি মিত্র, নানা প্রান্তে প্রতিদিন গরিব নিরীহ বাঙালি হিন্দু মুসলমানের বাড়ি ঘর পুড়ছে, লাঞ্ছনা হচ্ছে, নেলি, গহপুর, কামপুরের গণহত্যা হচ্ছে, তখন বিজেপির আদবানি, বাজপেয়িরা আসাম আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক বলে আখ্যায়িত করছেন শিলচরে তাঁদের দোসররা শরণার্থীদের দুঃখে চোখ ভাসিয়েছেন আর শরণার্থীদের চিরদিনের জন্যে সর্বনাশ করার জন্যে যখন প্রফুল্ল মোহন্ত- ভৃগু ফুকনরা দিল্লিতে কেন্দ্রের সরকারের সাথে আলোচনা করতে গিয়ে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদের তাঁরাই ছিলেন দিল্লিতে তাঁদে লোক্যাল গার্জিয়ান একই কথা সত্য, কংগ্রেসের জন্যেও শিলচরে এলে তাঁদের বড়ো মেজো ছোটে নেতারা সবাই উনিশ-প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে যান অথচ বিধানসভায় তাঁরা স্পিকটি নট আসাম সরকারের ভাষিক আগ্রাসনের বেশিরভাগ সনদ এঁদের সময়কালেই তৈরি কুড়ি তারিখ শহরে গগৈ আসবেন

শিলচর এলেই পুরনো কর্মস্থল কাছাড় কলেজে যাই এবারও গেলাম ট্রাঙ্ক রোডের কলেজের গেট থেকেই কানে এলো মুখ্যমন্ত্রীর জনসভার বক্তাদের বজ্রহুঙ্কার গমগম করে মাইক বাজছে সব কথা সব গান স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে কলেজে ঢুকেই দেখি আমার প্রাক্তন সহকর্মীরা শশব্যস্ত পরীক্ষার খাতা নিয়ে বিভিন্ন রুমের দিকে এগোচ্ছেন তাঁর মানে আজ পরীক্ষা? বন্ধুরা বললেন, পরীক্ষা মানে হায়ার সেকেন্ডারি ফাইনাল পরীক্ষা এবং সেদিন পরীক্ষা গণিতপত্রের আমি অবাক! ফাইন্যাল পরীক্ষা চলছে আর পাশের মাঠ থেকে গাঁক গাঁক করে মাইক বাজছে! তো জীবনে শুনিনি হচ্ছে তো হচ্ছে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর জনসভা! যিনি রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার কাণ্ডারী, তিনিই আইন ভেঙে সভা করছেন! আমি জনে জনে জিজ্ঞেস করি, প্রতিবাদ হওয়া উচিত নয় কি? আমরা তো এই শহরেই আগে দেখেছি, ফাইনাল পরীক্ষার মরশুমে নাজিরপট্টি প্রেমতলা অঞ্চলে হ্যান্ডমাইক নিয়েও পথসভা করার অনুমতি দেওয়া হত না একজন প্রাক্তন সহকর্মী বললেন, এই মুহূর্তে শুধু হায়ার সেকেন্ডারি নয়, স্কুল ফাইনালও চলছে সকালবেলা যখন স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে পরীক্ষার্থীরা হল থেকে রাস্তায় নেমেছে এবং হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে রাস্তায় বেড়িয়েছে, তখনই শহর জুড়ে বাস ট্রাক টেম্পো মিনিবাস করে মুখ্যমন্ত্রীর সভার লোক ঢুকছে শহরে ফলে যানব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন এই কথা বলার সময়ে ডিএসএ থেকে যখন বক্তৃতা ভেসে আসছে, তখন ট্রাঙ্করোড থেকে আরেকটি মাইকে ভেসে এলো চিলচিৎকার করা গান আমি বললাম, আবার কী? শুনলাম, মোদীর জনসভার প্রচার করার জন্যে বিভিন্ন বাজারহিট হিন্দি গানের সুরে মোদী নিয়ে বাঁধা গান মাইকে বাজিয়ে বাইশ তারিখের সভার প্রচার চলছে বেশ কিছুদিন ধরে তার মানে পরীক্ষা দিতে এসে গগৈর মাইক, বাড়িতে পড়তে বসলে মোদীর মাইক! আমি অবাক এমন অসভ্য সংস্কৃতিতে ভর করে রাজনীতির প্রচার তো শহরে আগে কখনো শুনি নি মোদী বা গগৈ নাহয় বাইরের লোক, কিন্তু যাঁরা এই শহরে এই উপত্যকায় এই মাইকবাজি করছেন, তাঁদের বাড়ির ছেলেমেয়েরাই তো স্কুল ফাইনাল বা হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার পরীক্ষার্থী! সবাই বুঝি কালিদাস হয়ে গেলেন! যে ডালে বসেছেন, সেই ডালেই দায়ের কোপ চালাচ্ছেন


মোদী আসবেন, আবার আমাকে আজই ফিরতে হবে কলকাতায়। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ি বিমানবন্দরের দিকে। গাড়ির চালক বলল, মোদী আসবেন সাড়ে এগারোটায়। আমি বললাম, তবে প্লেন লেট হবে না তো? চালক ভরসা দিয়ে বললেন, না না, উনি হেলিকপ্টারে আসবেন আগরতলা থেকে। পথে পথে উৎসাহী জনতারা ছুটছে রামনগরের দিকে। বাচ্চা বুড়ো নওজোয়ান মহিলা সবাই। চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। মনে হচ্ছে, রামরাজত্বের ঠিকানা বোধহয় রামনগরের আইএসবিটি-লাগোয়া মাঠেই। শুনলাম গুজরাট থেকে এসেছে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অফিসাররা। বাংলাদেশ থেকে বলা যায় না কখন কোনোউগ্রবাদীঢুকে পড়ে। পাটনায় যা হল! শিলচরে নাকি একজন ধরাও পড়েছে। জানা যায় নি অবশ্য সে সত্যিই উগ্রবাদী কিনা। সব কথা শুনতে শুনতে মন চলে যায় উনিশো নিরানব্বুইয়ে। সামনে লোকসভা নির্বাচন। দেশের দিকে দিকে প্রতিদিন ধরা পড়ছে আইএসআই এজেন্ট। সাঙ্ঘাতিক সব ঘাতকবাহিনী নাকি এদেশের কোণে কোণে ঢুকে পড়েছে। সে সময়ই হঠাৎ স্থানীয় খবরের কাগজে একটি সংবাদ বেরোলো।শিলচর সুভাষনগরে ভর সন্ধ্যায় ধৃত এক আইএসআই-এজেন্ট বিস্তারিত খবরে জানা গেল কোনো এক বাড়িতে ঢুকে নাকি উঁকি ঝুঁকি মারছিল সেইআইএসআই এজেন্ট উদ্দেশ্য ঠিক বোঝা যায় নি। পোষাক ছিল ঠিক তেমনই, যেমনটা হওয়া উচিত আইএসআই এজেন্টের। লুঙ্গি-পাঞ্জাবি। চেহারাও যেমনটা হওয়া উচিত তেমনই। মাথায় তকি গালে দাড়ি। পাড়ার জাগ্রত কিছু ছেলেছোকরার তৎপরতায় অন্তর্ঘাত ঘটে নি! ছেলেরাআইএসআই এজেন্টকে উত্তম মধ্যম দিয়ে রক্তাক্ত করে পুলিসের হাতে তুলে দিয়েছে।

ভোট টোট চুকে যাওয়ার পর স্বাভাবিক ভাবেই সারা দেশেআইএসআই এজেন্টধরা পড়ার ঘটনা কমে এলো। শিলচরের একটি ছোট কাগজ সংবাদ শিরোনাম করেছিল, ‘ভোট শেষ, আইএসআই শেষ‘ অনেকদিন পর ওই পাড়ার আমার পরিচিত এক হিন্দুবাদী ছেলে সাথে দেখা। জিজ্ঞেস করলাম, তোদের পাড়ায় যে আইএসআই এজেন্ট ধরা পড়েছিল তার কী হল রে? প্রায় বুক অবধি জিভ বের করে সে বলল, আর বোলো নো, ব্যাটা বাংলাদেশের বাঙ্গাল, এসেছিল সিলেট থেকে ওর এক বন্ধু চিঠি পাঠিয়েছে শিলচরে আত্মীয়কে। সেটা পৌঁছে দিতে এসেছিল। ত্রিসন্ধ্যা সময় জানালা দিয়ে হিন্দু পাড়ায় এক দাড়ি লুঙ্গি উঁকি মারছে দেখে বাড়ির লোকেরা আর্ত চিৎকার দিয়েছিল। কী করবে, সারা দেশে তখন আইএসআই এজেন্ট ধরা পড়ছে। আমরা তো ব্যাটাকে ধরে উত্তম মধ্যম দিয়ে পুলিসের হাতে তুলে দিলাম। পরে শুনলাম, ওই বাড়ির সিলেটের আত্মীয়েরই বন্ধু তিনি। বন্ধুর পত্রবাহক হয়ে এসেছিলেন তিনি! আমি সব শুনে তাঁকে বললাম, ওই ভদ্রলোক -সাম্প্রদায়িক হতেই পারেন। কিন্তু এই ঘটনার পর বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে তিনি জামাতপন্থী হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে যান, তখন তাঁর এই চরিত্র পরিবর্তনের দায় তুই বা ওই বাড়ির লোকেরা নেবেন কি? সেই ভদ্রলোক যদি পরের বার আমি সিলেট গেলে আমাকে এমন ধোলাই দিয়ের‘-এর এজেন্ট বানিয়ে পুলিসের হাতে তুলে দেন, তার জন্যে দায়ি কে থাকবে? উত্তরে সে বলল, কী করবে! পলিটিক্সে এরকম হয়-ই। কথাটা এতদিন পর লিখতে গিয়ে আমার ইশরাত জাহান নামের তরুণীটির কথা মনে পড়ছে, যাকে গুজরাটের পুলিস উগ্রপন্থী আখ্যা দিয়ে কোনো বিচার প্রক্রিয়ায় না গিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। জানি না, ‘মোদীজী‘র সভার আগে ওরকম কোনোআইএসআই এজেন্টশিলচরে ধরা পড়ল কি না। কারণ, দোরগোড়ায় যে ভোট আবার!


বিমানবন্দরে বসে আছি চেক ইন করে। হঠাৎ দেখলাম হন্তদন্ত ঢুকছেন কবীন্দ্র বাবু। শুনলাম মোদীর চার্টার্ড প্লেন একটু পরেই নামবে কুম্ভীরগ্রামে। আকাশ থেকে নামল ছোট্টো সুদৃশ্য একটি প্লেন। জানালার কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি থেকে সাধারণ স্টাফ সবাই। লাউঞ্জের টিভিটায় কেউ এসে ধরলেন এনইটিভির চলতি সম্প্রচার। রামনগর থেকে রিপোর্ট করছেন সংবাদদাতা। বলছেনমানুষের ঢল নেমেছে। যে মাঠে সভা হচ্ছে, সেই মাঠটি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের। তাঁরা অনুমতি দিয়েছে সভা করার। তার মানে মোদীর মুসলিম-বিরোধী ভাবমূর্তি এখন অতীত হয়ে গেছে।সহজ সমীকরণ? বিমানবন্দরের ক্লিনার থেকে সাধারণ গরিব কর্মী ঝুটে এলেন এবার টিভির কাছে। পরক্ষণেই ছুটে গেলেন জানালার দিকে। মুখে হাসির ঝিলিক। চড়াই পাখির মত একটি হেলিকপ্টার এগিয়ে গেল ঝাঁ চকচকে চার্টার্ড প্লেনের দিকে। মোদীকে দেখতে পেলাম না। দেখার খুব একটা ইচ্ছেও ছিল না। আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল হেলিকপ্টার। উড়ল আকাশে। আমরাও সিকিউরিটি চেক শেষ করে আস্তে আস্তে হেঁটে চলেছি আমাদের প্লেনের দিকে। ডানদিকের কোণে পার্ক করা মোদীর চার্টার্ড ফ্লাইট। ঝাঁ চকচকে। আয়তনে আমাদের বিমানের মতই। এই বিমানেই এখন চষে বেড়াচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। প্রতিদিন সভা। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিড় করে আসে জনসভায়। একই আগ্রহ নিয়েই একবার টিভির পর্দায়, একবার বিমানবন্দরের জানালায় ছুটে গেলেন বিমানবন্দরের কর্মীরা তাঁকে একবার দেখতে। তেমন উন্মাদনা নাকি সর্বত্র।

প্লেনটার দিকে তাকালাম শেষবার। দূরে দেখা যাচ্ছে আকাশে হেলিকপ্টার। এখন বুঝি তিনি আর ট্রেন চড়েন না? চড়েন না কোনও ভূতল পরিবহনেও? শুধুই আকাশে সওয়ার? প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অবধি শুধু আকাশে? কখনো আধঘন্টা, কখনো চল্লিশ মিনিট কখনো একঘন্টা মাটিতে, কিন্তু সু-উচ্চ সভামঞ্চে। বক্তৃতা, তারপরই আবার আকাশে। ট্যুইটার খুলে দেখলাম কে যেন বলছে, তাঁর এই আকাশ-সওয়ারি প্রাক-নির্বাচনী প্রচারের বাজেট পাঁচশো কোটি টাকা। তারপর আসবে নির্বাচন। তখন নির্বাচনী প্রচারে আবার কয়েকশো কোটি! কেউ বললেন, এবারের নির্বাচন টাকার অঙ্কে রেকর্ড গড়বে! কে দেয় এই টাকা? কখনো তো দেখি না, চাঁদার কুপন হাতে রসিদ বই নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরছে ওই দলের স্বেচ্ছাসেবকরা। কে দেয়? তবে কি সত্য যে তাঁর এই বিপুল ভাবমূর্তি নির্মানের প্রচারাভিযানের টাকার জোগান দিচ্ছে ভারতের বড়ো বড়ো বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি? এটাও কি সত্যি, এই জন্যে সব বিষয়ে মুখর মোদী এক ডলারের তেল আট ডলারে কেন কিনতে হয় এই প্রশ্নে একটি কথাও বলছেন না পাছে ফান্ড ম্যানেজাররা অসস্তুষ্ট হয়? প্লেনের জানালা দিয়ে শেষ বার দেখি মোদীর উড়ালপাখিকে। এবার মনে ভেসে এল, বিমানবন্দরের সাফাইমহিলাদের মুখ। ভেসে এল রামনগরের মাঠে হাজির হওয়া লক্ষ লক্ষ সাধারণ দরিদ্র মানুষের মুখের হাসির ঝিলিক। যদি প্রধানমন্ত্রী শেষপর্যন্ত হনও, কার স্বার্থ রক্ষা করবেন মোদী? ওই হতদরিদ্র মানুষগুলির? নাকি যাঁরা তাঁর আকাশ-অভিযানের, তাঁকে ঘিরে আকাশছোঁয়া স্বপ্নের নির্মানের, সন্ধ্যার আকাশে ঝলমল করে ফুটে থাকা তারকার মত ভাবমূর্তি নির্মানের জন্যে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করছেন, তাঁদের? গরিব আর ধনীর স্বার্থরক্ষা যে একসাথে হয় না। একটা দলকে প্রতারিত করে অন্য দলের বিশ্বাসভাজন যে হতেই হবে। কার স্বার্থ? কার স্বার্থে?
প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা!!!!